M3 Views

রাজনীতি, দলীয় এবং উন্নয়নী প্রসাশন

অমিয় চৌধুরী  | September 18, 2015

আবহমান কাল থেকে তত্ত্ব ও প্রয়োগ সংক্রান্ত ভাবনা নিয়ে লক্ষ লক্ষ শব্দ ব্যবহৃত হয়ে আসছে। সমাজ সংস্কারক ব্যক্তিত্বরা তো ছিলেন এখনো আছেন। কিন্তু সমাজের পরিবর্তনের বাহক কিন্তু রাজনীতিকরা। সব দেশে সবকালেই এটা ঘটে আসছে। তত্ত্ব দর্শন করানোর মন্ত্র দেন তাত্ত্বিকেরা। অথচ বৈপরিত্যটা দেখুন- এই তত্ত্ব তালাশি রাজনীতিকরাই ঠিক ঠিক তত্ত্বের প্রয়োগ করেন না। আর যারা করতে চেষ্টা করেন, তাদের কার্যাবলী তাত্ত্বিকে প্রায়োগিক আদর্শগত কর্মপন্থার বিপরীত হয়ে ওঠে। একথা কৌটিল্য, ইউরোপীয় রেনেসাঁসের ম্যাকিয়াভেলি থেকে শুরু করে হেগেল, মার্কস, মাও এবং আধুনিক কালের প্রশাসন বিশেষজ্ঞ ম্যাক্স ওয়েবার প্রমুখ চিন্তাবিদ দের সবার ক্ষেত্রেই কখনো না কখনো সত্য হয়ে দেখা দিয়েছে।

আসলে তাঁদের শব্দার্থের আড়ালে যে তত্ত্বদর্শন আছে, যে মঙ্গলকামী রাষ্ট্রব্যবস্থার আদর্শ আছে, অতীত থেকে বর্তমান পর্যন্ত কোন রাজনীতির প্রায়োগিক প্রধানরা তা মেনে চলেন নি। প্রথমে ম্যাকিয়াভেলির কথাই ধরা যাক। ম্যাকিয়াভেলি ইউরোপীয় রাষ্ট্রপরিচালনায় এক লেখক। অথচ তা সেই যুগে অর্থাৎ রেনেসাঁস থেকে আধুনিক কালে উত্তরনের সময় ইটালির বহুধা বিভক্ত দেশের ঐক্যের আদর্শে রচিত গ্রন্থ আধুনিক রাজনীতি চর্চায় আদর্শগত বিচ্যুতিতে পরিণত হয়। এই প্রসঙ্গে বাট্রেণ্ড রাসেলের হিস্টোরি অব ওয়েস্টার্ন ফিলোসফির একটা ইঙ্গিতপূর্ণ পঙক্তি মনে পড়ে। রাসেল বলেন-রাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে সকলের কাছেই ম্যাকিয়াভেলির তত্ত্ব ঘৃণিত, অথচ আশ্চর্যের ব্যাপার, কোন না কোন ভাবে এবং ক্ষেত্রে রাজনীতিকরা ম্যাকিয়াভেলিকেই অনুসরন করেন। রাসেল-এর পর্যবেক্ষণ অতীতে যেমন ছিল, আজ ও তা সত্যি।

আসল কথা আদর্শগত তত্ত্ব মেনে কেউ রাজনীতি করেন না। এই কথাটির ব্যাখ্যার প্রয়োজনেই এই নিবন্ধ। কোন কোন তত্ত্ব পরিবরতিত, পরিবর্দ্ধিত করেও অনেক রাজনীতিক তাদের প্রয়োগের বাহবা দেখাতে নিয়েছেন। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই আগে বা পরে তা ব্যর্থ হয়ে গেছে। রাজনীতির লক্ষ্যই তো হলো-দেখা যে মানুষ আছে এবং ভবিষ্যতে থাকবে। ইতিহাস তো স্থবির নয়। এক জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকা তার কাজও নয়। অতএব ১০০/২০০ বছর আগের ইতিহাসের অবশ্যই ঐতিহাসিক মূল্য আছে। কিন্তু সেই সময় কার সমাজ, সংসার অর্থনীতি, জাগতিক, রীতিনীতি আজকের অর্থাৎ বর্তমানের সমাজ ব্যবস্থায় বসিয়ে দেওয়া যায় না। হেগেলীয় রাষ্ট্র ভাবনায় রাষ্ট্রের পরিপূর্ণতার কবলে একক মানুষ মনুষ্যপিণ্ডমাত্র। চলমান ইতিহাস যেখানে পূর্ণতা পায় সেটা এক চরম আদর্শগত রাষ্ট্রব্যবস্থা। রাষ্ট্রের জন্য রাষ্ট্র। আদর্শগত ভাবে সেই স্রষ্টা। মানুষের চেতনার উৎস। যেমন রবীন্দ্রনাথের কথা, আমারি চেতনার রঙে পান্না হলো, সবুজ চুনি উঠলো রাঙা হয়ে।

ভাববাদী আদর্শগত চিন্তায় এই ধারণা বাতিল করা বড় সহজ নয়। এই চিন্তার মূলে কুঠারঘাত না করে এই তত্ত্বের বিস্তারকে রুখে দেওয়া যায় না। লোকে বলে থাকেন এই তত্ত্ব দিয়েই বোধ হয় জার্মানির জাতীয় সমাজবাদ, যা নাকি হিটলার প্রবর্তন করতে চেয়েছিলেন নিজের স্বার্থে, ব্যাখ্যা করা যায়। অনুরূপ ভাবে কার্ল মার্কস ও তার তত্ত্বে তিনি সমাজ নামক এক বিশাল অরণ্যের রূপ দেখেছিলেন। ব্যক্তি মানুষের দিকে লক্ষ্য দেননি। অথচ সমাজ তাত্ত্বিক হিসেবে তিনি কিন্তু মানবতাবাদীই ছিলেন। মানুষের মঙ্গল চেয়েছিলেন। মনুষ্যত্বের বিকাশ ঘটাতে চেয়েছিলেন। তিনি ভেবেছিলেন একক মানুষ সমাজের গর্ভস্থিত একটা চলমান নৈর্ব্যক্তিক অস্তিত্ব মাত্র। এমনটা হলেই নাকি মানুষের পরিপূর্ণ বিকাশসাধনা সম্ভব। এ হচ্ছে সমুদ্রকে সামনে রেখে বিস্তৃত চাদরে মোড়া বালুকারাশি মাত্র। আলাদা করে বালুকণার অস্তিত্ব এখানে গৌণ একান্তই। এটা দৃষ্টিভঙ্গি মাত্র, দৃষ্টিবিভ্রান্তি নয়।

মার্কস রাষ্ট্রের বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা বা কোন রাষ্ট্র বিজ্ঞানীর তাত্ত্বিক অবস্থান নেননি। তিনি সমাজতাত্ত্বিক। তৎকালীন রাষ্ট্রব্যবস্থায় সমাজের বিবর্তন এবং পরিবর্তন নিয়ে ভেবেছেন। হেগেলীয় দর্শন আর মার্কসবাদী ভাবনায় বিবর্তনী ইতিহাসের পূর্নতা, যেখানে ইতিহাসের শেষযাত্রা পরিপূর্ণ রাষ্ট্রীয় অস্তিত্বের কবলে। অপরদিকে মার্কস ভেবেছেন রাষ্ট্র ধ্বংস তত্ত্বে এক আদর্শগত সাম্যবাদী অস্তিত্বে সামাজিক ইতিহাসের চলমানতায় প্রশাসনিক গুরুত্বকে অস্বীকার করা যায় না। কোথাও এসেছে রাজপুরুষের হাত ধরে আর কোথাও একতান্ত্রিক কোন দলের অঙ্গুলি হেলনে।

মার্কস যা ভেবেছিলেন ঊনবিংশ শতাব্দির মাঝামাঝি সময়ে, সেই ইতিহাস কাল আর নেই। তবে অবশ্যই মার্কসীয় মতবাদকে যুগোপযোগী করে নেওয়ার কথা মার্কসই বলে গিয়েছিলেন। ভাবাভাবির দর্শন তো অনেক হলো, এবার সময় এলে কাজে হাত লাগানো, কাজ করে দেখানো। কিন্তু যারাই তা করতে গেছেন, তাঁরাই তাঁরাই ইতিহাস তৈরি করেছেন হিংসাশ্রয়ী। জনগনের চরম উন্নয়নের পথে এগিয়ে দেওয়ার নাম করে দলতন্ত্রের জালে শক্ত করে বেঁধে ফেলেছেন। মানুষের আশা, আকাঙ্খা পিষে ফেলে তাদের দেওয়া হয়েছে নির্বাক, ভীতু অবোধের দৃষ্টির প্রসারণ। দেশের জনগণকে দেওয়া কালো রুটির টুকরো আর পশুচর্বিতে জারিত খাদ্য। এইসব দলীয় প্রশাসনের কব্জায় সম্পূর্ণভাবে নিয়ে আসা হয়েছিলো দেশের মানুষকে মানবপিণ্ড আকারে। মুখে কথা ছিলনা আর চোখে ছিল না ভাষা।

উদারপন্থী গণতান্ত্রিক বহু মানুষের স্মাজ দৃষ্টি আবিল তথাকথিত সমাজতান্ত্রিক দেশগুলোতে বিশেষ করে লেনিন, স্ট্যালিনের সোভিয়েত দেশ আর মাও-সে-তুঙ এর চিন নামক এক ক্রম প্রসারমান ভূখণ্ডের প্রতি।

পরবর্তী পর্যায়ে...

< Back to List

 
Comments (0)
 
 
Post a Comment Comments Moderation Policy
 
Name:    Email:
 
Comment:
 
 
 
Security Code:
(Please enter the security code shown above)
 

Comments and Moderation Policy

MaaMatiManush.tv encourages open discussion and debate, but please adhere to the rules below, before posting. Comments or Replies that are found to be in violation of any one or more of the guidelines will be automatically deleted.

  • Personal attacks/name calling will not be tolerated. This applies to comments or replies directed at the author, other commenters or repliers and other politicians/public figures. Please do not post comments or replies that target a specific community, caste, nationality or religion.

  • While you do not have to use your real name, any commenters using any MaaMatiManush.tv writer's name will be deleted, and the commenter banned from participating in any future discussions.

  • Comments and replies will be moderated for abusive and offensive language.

×

© 2017 Maa Mati Manush About Us  |  Contact   |   Disclaimer   |   Privacy Policy   |   Site Map