M3 Views

রাজনীতি, দলীয় এবং উন্নয়নী প্রসাশন
(দ্বিতীয় অংশ)

অমিয় চৌধুরী  | September 23, 2015

সমাজতান্ত্রিক যে দেশগুলো পর্দার আড়ালে একদা যারা আত্মগরিমায় যা নাকি লোক চক্ষুর অন্তরালে ছিল, তাদের নিয়ে গণতান্ত্রিক দেশে তথাকথিত সাম্যবাদী মানুষের গর্বের সীমা ছিল না। পূর্ব ইউরোপ, সোভিয়েত রাশিয়া, চিন, কিউবা দেশগুলোর অভ্যন্তরীণ অঞ্চলে সাধারণ মানুষ কেমন জীবন যাপন করতো, আমাদের দেশের তথাকথিত সাম্যবাদী দলগুলোর সেই বিষয়ে মাথাব্যাথা ছিলনা। রাষ্ট্রীয় প্রশাসন সাধারণ মানুষের জন্যে উন্নয়নমূলক কি ব্যবস্থা নিয়েছিল সেটা বড় কথা ছিলনা। ধনতান্ত্রিক গণতন্ত্র কি ধরনের ষড়যন্ত্রে সমাজতান্ত্রিক দেশের উপর আক্রমণে উদ্যত এটাই তাদের উদ্বুদ্ধ করতো। নানা মিটিং, মিছিল আর প্রচারের আলোয় তাদের ক্ষমতা প্রদর্শনের চেষ্টায় সদাব্যস্ত থাকতো। অথচ এখন কোথায় সোভিয়েত সমাজবাদ, কোথায় মার্কসীয় দর্শনের প্রয়োগ, কোথায় মাওবাদের গুনগত শ্রেষ্ঠত্ব!

চিন এখনো কিঞ্চিৎ মাওবাদ সিক্ত থাকলেও, সেখানে অর্থনীতির দিক থেকে কিছুটা পরিমার্জিত হলেও দলতান্ত্রিক প্রশাসন ছাড়া সেথা বিন্দুমাত্র গণতান্ত্রিক রীতিনীতির প্রচলন ঘটেনি। নর্থ কোরিয়াতে আরও ভয়ঙ্কর গণতান্ত্রিক বা আধাগণতান্ত্রিক মানুষের ভাষার কিছু শব্দইতো সেখানে অনুপস্থিত। যেমন ধরা যাক ধর্মের কথাটা। ধর্মই তো বিভিন্ন অর্থে ব্যবহৃত। অথচ ওরা সামরিকতন্ত্র, যুদ্ধতন্ত্র, অস্ত্রতন্ত্র ছাড়া আর কিছুই বোঝেনা। সাধারণ মানুষের সেখানে জৈবক অস্তিত্ব ছাড়া আর কিছুই নেই। দল, রাষ্ট্র, সমাজ, সরকার আর সামরিক কর্তৃত্বপরায়নতা, সবই এক। ভিয়েতনাম, কিউবা অবশ্য তাদের কার্যপ্রণালী এবং ভাষায় আধুনিকতার আলো কিছুটা হলেও পরিমার্জন করে প্রশাসনের একটা ভূমিকা তৈরি করতে চেষ্টা করছে। চিনসহ এইসব পরিমার্জনার জন্যেই সোভিয়েত রাশিয়ার মত অত সহজে টুপ করে পড়ে যায়নি। রাষ্ট্রীয় প্রশাসনে যদি কর্ম বিন্যাস এবং স্তরের নির্দিষ্ট বিন্যাস করা না হয় তবে সেই ব্যবস্থা শেষ পর্যন্ত মানুষের দুর্দশার অন্তহীন কারণ হয়ে পড়ে।

সুশাসনের উদ্দেশ্য বিচার হল সমাজে মানুষ সমাজবদ্ধভাবে কত সুষ্ঠুভাবে জীবন যাপন করতে পারছে। এই নিবন্ধের প্রথম দিকে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার নামে মার্কসবাদের সঙ্গে আত্মপরায়ন কর্তৃত্বের দাম্ভিকতা মিশিয়ে এক ভয়ঙ্কর রাষ্ট্রব্যবস্থা চালু করেছিল। যা ছিল সম্পূর্ণই দলীয় রাষ্ট্র এবং কঠোর ভাবে নিয়ন্ত্রিত সমাজ। এমনকি দলীয় প্রশাসনিক স্তরেও ছিল ভয় এবং সন্দেহ মিশ্রিত দলীয় স্তরের নেতৃতন্ত্র। কেউ কাউকে বিশ্বাস করছে না। তথাকথিত জনগণতন্ত্রে অথচ এই ব্যবস্থায় জনগণই এক রকমের নামানুষে পরিণত। অথচ মানুষের উন্নয়নে লেনিন মার্কসবাদ থেকে তাঁর প্রসূত এক তত্ত্বে সোভিয়েত রাশিয়াকে গড়তে চেয়েছিলেন। গণতান্ত্রিক এককেন্দ্রিকতা। এর মাধ্যমেই নাকি দেশের, প্রশাসনের উন্নতি হবে দ্রুত। গণতান্ত্রিক অথচ সর্বস্তরেই উন্নয়ন ঘটবে এককেন্দ্রিক নেতৃত্বের মাধ্যমে। কেন্দ্রিকতাই যেখানে মূল পরিচালিকা সেখানে বিকেন্দ্রিকতা প্রয়োগ হবে কীভাবে? অর্থাৎ এ হল এক সোনার পাথরবাটি তত্ত্ব।

তবে লেনিনের স্বপ্ন এবং পাণ্ডিত্যকে নিশ্চয়ই অস্বীকার করা হচ্ছে না। অসুস্থ লেনিন বেশিদিন বাঁচেননি। প্রায় মৃত্যুর মুখোমুখি হয়ে তিনি দলীয় প্রশাসনকে কিছুটা হলেও গণতান্ত্রিক রূপ দিতে চেয়েছিলেন। স্ট্যালিনের রুঢ়তা, স্বেচ্ছাচারিতা আর অন্তিম ষড়যন্ত্রে লেনিনের শেষ ইচ্ছা পূরণ হয়। এক নায়কতান্ত্রিক দলীয় ব্যবস্থায় এমনটাই হয়ে থাকে। স্ট্যালিনকেও সরতে হয়েছিল ষড়যন্ত্রের করুণ শিকার হয়েই। ১৯৩০-র দশকে রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীদের এবং তাঁর একতান্ত্রিক প্রশাসনের বিরোধী হাজারে হাজারে মানুষজনকে বেপাত্তা হতে হয়েছিল। এখন এসব খোলা বইয়ের মধ্যে ইতিহাস হয়ে আছে। স্ট্যালিনের মৃত্যু হয়েছিল তারই প্রিয়তম নেতৃবৃন্দের ইচ্ছাকৃত অবহেলায়। কেউ কেউ বলবেন ষড়যন্ত্র (The Mistry of Stalin’s Death)।

২৮ ফেব্রুয়ারি ১৯৫৩, স্ট্যালিনের বাসা থেকে নৈশভোজন করে ফিরে গেলেন। ক্রুশ্চেভ, বুলগানিন, ম্যালেনকভ, বেরিয়ারা। পরদিন প্রহরীরা সারাদিন স্ট্যালিনেকে ঘর থেকে বেরোতে দেখলেন না স্ট্যালিনের দেহরক্ষী, পরিচারক, পরিচারিকারা। বিকাল ঘনালে সবচেয়ে কাছের পরিচারিকা ঘরের দরজা খুলে দেখলেন, মেঝেতে অচৈতন্য হয়ে পড়ে আছেন স্ট্যালিন। তাঁর প্যান্ট নোংরা এবং ভিজে। ভয় পেয়ে তিনি অন্যদের ডাকলেন। তারা এসে অচেতন স্ট্যালিনকে সফায় তুলে শোয়ালেন, টেলিফোনে খবর দিলেন ক্রুশ্চেভ, ম্যালেনকভ, বেরিয়ারাদের। তাঁরা কেউই এলেন না। তাঁরা তখন ব্যস্ত দলীয় প্রশাসনিক নতুন নেতা নির্বাচনে। তারপর চারদিন গেল। মাঝখানে পরিচারকরা বারবার ফোন করে হতাশ হন। আসছি বলে কেউ আসেন না।

পঞ্চম দিন অর্থাৎ ৫ মার্চ সদলবলে এলেন বাঘা বাঘা নেতারা। ততক্ষণে পলিট ব্যুরো, সেন্ট্রাল কমিটি সবই তৈরি হয়ে গেছে। ওরা এসে মহাশক্তিধর স্ট্যালিনকে ওই অবস্থায় দেখে, ওঁকে বিছানায় শুইয়ে দিতে বললেন। অচেতন স্ট্যালিনের মুখ দিয়ে যেন বহুদূর থেকে একটা অর্ধশব্দ শোনা গেল। ডাক্তার। তখনই একবারমাত্র দলের ডাক্তারকে ডাকা হলো। তিনি এসে পরীক্ষা করে বললেন স্ট্যালিন মৃত। ডাক্তারকে দিয়ে হাসপাতালে দেহ পাঠানো হল ওটিকে মলম মাখিয়ে সতেজ রাখার জন্য। পরবর্তীকালে অবশ্য দেহটি মমিতে রূপান্তরিত করে লেনিন মসোলিয়ামে রাখা হয়। তারপর একদিন ক্রুশ্চেভের ডিস্ট্যালিনাইজেশনের যুগে দেহটি পুড়িয়ে দেওয়া হয়। আর একটা ছোট্ট পুতুলের আকারে স্ট্যালিনকে ক্রেমলিয়নের দেওয়ালে শত শত মৃত শহীদ বা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে হত সৈনিকদের পাশে স্থানান্তরিত করা হয়।

স্বেচ্ছাচারিদের এরকম অন্তিম পরিণতিই হয়। কারণ তাঁরা রাষ্ট্র পরিচালনায় দলের বাইরের কোন যুক্তিবাদী কর্তব্যনিষ্ঠ মানুষকে প্রশাসনের বিভিন্ন পদে প্রতিষ্ঠিত করতে চাননা। সুতরাং ওই সব দেশের প্রশাসনিক ব্যবস্থা আলোচনার পর্যায়ে আসে না। মানুষকে কিছু অখাদ্য, নিম্ন মানের খ্যাদ্য পরিবেশন করে তাদের অন্তরাত্মাকে চিরদিনের মত শেষ করে দেওয়া যায় না। সুযোগ পেলেই তারা তাদের কথা বলার স্বাধীনতা আর স্বাতন্ত্র্য ব্যক্তিত্বের অধিকার দাবি করতে রুখে দাঁড়ায়। এটাই ইতিহাসের শিক্ষা। কষ্ট কল্পিত সমাজতান্ত্রিক অলীক সামবাদী (যা কিনা একটা অর্ধপক্ষ আদর্শমাত্র) ব্যবস্থায় তাই প্রশাসনিক তত্ত্ব বা তার প্রয়োগ দেখা যায় নি। আর গেলেও তার উন্নয়ন বা আধুনিকীকরণ হয়নি। এইখানেই জ্বলজ্বল করে ওঠে সমাজতান্ত্রিক ম্যাক্স অয়েবারের প্রশাসনিক স্তর বিন্যাস এবং তার শ্রেণী বিভাজন।

উদারনৈতিক গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় যেমন দীর্ঘদিনের ব্রিটেন এবং স্বাধীন হওয়া আমেরিকার রাজনীতি, সামাজিক অবস্থান এবং তার প্রশাসনিক স্থিতি ও প্রক্রিয়া নিয়েই উন্নত প্রশাসনিক ব্যবস্থার এত আলোচনা, এক দিক নির্দেশের ভাবনা। যার উদ্দেশ্য হল এক স্থিতাবস্থাকে উন্নততর স্থিতাবস্থায় নিয়ে যাওয়া। যা সম্ভব আইন কানুন এবং বিভিন্ন সময়ের প্রশাসকদের উন্নত কার্যকারিতার জন্য প্রশাসনের স্তরবিন্যাস। এই স্তরবিন্যাসের ফলেই জনগণের ন্যায্য চাহিদাগুলো পূরণ করা হয়, তা পরিকল্পনা হয়। দায়িত্ব রাজনৈতিক কর্তাদের নীতি প্রণয়ন আর তার নিচু স্তরের দায়িত্ব সেই নীতি নির্ধারণের রুপায়ন। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় সবই সাধারণ মানুষের জন্যই।

< Back to List

 
Comments (0)
 
 
Post a Comment Comments Moderation Policy
 
Name:    Email:
 
Comment:
 
 
 
Security Code:
(Please enter the security code shown above)
 

Comments and Moderation Policy

MaaMatiManush.tv encourages open discussion and debate, but please adhere to the rules below, before posting. Comments or Replies that are found to be in violation of any one or more of the guidelines will be automatically deleted.

  • Personal attacks/name calling will not be tolerated. This applies to comments or replies directed at the author, other commenters or repliers and other politicians/public figures. Please do not post comments or replies that target a specific community, caste, nationality or religion.

  • While you do not have to use your real name, any commenters using any MaaMatiManush.tv writer's name will be deleted, and the commenter banned from participating in any future discussions.

  • Comments and replies will be moderated for abusive and offensive language.

×

© 2017 Maa Mati Manush About Us  |  Contact   |   Disclaimer   |   Privacy Policy   |   Site Map