M3 Views

।। ভারতের সংসদ কী শান্ত! নভেম্বর ২৬ একই সঙ্গে সংবিধান দিবস আর বাবাসাহেব আম্বেদকরের ১২৫ তম জন্মদিন স্মরণ করা হল ।।

অমিয় চৌধুরী  | December 4, 2015

অঙ্গীকার ছিল দৃষ্টান্ত কলামের পরে লেখাচিত হবে উন্নয়নমূলক প্রশাসন। কিন্তু এই উন্নয়নী প্রশাসন লিখতে বসে শব্দ সংখ্যা হয়ে গেল তিন হাজার। অতএব লেখাটি অন্য একটি লিখিত পত্রিকায় দিতে হলো। তাই এখানে অতি সম্প্রতিকালের একটা উল্লেখযোগ্য ঘটনাকে ভিত্তি করে লিখতে হচ্ছে।

কথা ছিল সংসদের শীতকালীন অধিবেশনটি শুরু হবে ২৬ নভেম্বর। অনেক জরুরী কার্যকর্ম সারতে হবে এই অধিবেশনে। অর্থমূল্য বিচার করলে- সংসদের যে কোন একটি কক্ষের দৈনন্দিন অধিবেশনে প্রতি মিনিটে খরচ হয় তিন হাজার টাকার অধিক।

আর এখন তো ২০১৪ সংসদীয় নির্বাচনের পর থেকেই দ্রব্যমূল্য আকাশ ছোঁয়া। কর্পোরেট হাউস গুলো এত কোটি কোটি টাকা খরচ করেছে নিজেদের পছন্দমত দলকে জিতিয়ে আনতে। তাদের খরচের লিখিত হিসাব ভারতের আম জনতার জানার কথা নয়। আম জনতা যা হাড়ে হাড়ে জানতে পারছে সেটা হলো বছরে যে কোন সাধারণ ডালের মূল্য দুশো টাকা ছাড়িয়ে গেছে। আম জনতার প্রতিদিনের খাওয়ার বিশেষ দ্রব্যটিই তো ডাল। কেননা ডাল দিয়েই ভাতের অনেকটা বা কোন কোন দরিদ্র পরিবারে ভাতের সঙ্গে ডালই একমাত্র খাদ্য। কর্পোরেট হাউসগুলো এবং ব্যবসায়ীরা এতটাকা খরচ করেছে উপলক্ষে। এখন তো তারা জনসাধারণের ধনী-দরিদ্র নির্বিশেষের কাছ থেকে সেই টাকাই তুলতে চাইছে।

এখানে যা বলতে চাওয়া হয়েছিল, ২৬শে নভেম্বর সংসদের দুই কক্ষেই অধিবেশন শুরু হলো। ১৯৪৯ সালের ২৬শে নভেম্বর সংবিধান আইন রূপ পেয়েছিল এবং সংবিধানটি গৃহীত হয়েছিল। অতএব একটা দিন সংবিধান দিবস হিসাবে সংসদ আলোচনা করতেই এই অধিবেশন। তারপর হঠাৎ, সবগুলো বড় দলের অনুমোদন সাপেক্ষে, সংবিধান দিবসের সঙ্গে বাবা সাহেব আম্বেদকরের ১২৫ তম জন্মদিনের প্রাক দিবস পালন করা হলো। সংসদের অধিবেশন চলল পুরো দুটো দিন ধরে। প্রত্যেকটি দলের একাধিক সদস্যের অজস্র গালভরা বুলি বেরুলো শুধুমাত্র আম্বেদকরের প্রথম জীবন, তার ভাগ্যের সঙ্গে লড়াই, নেহেরুর মত কাব্যকরে বললে- নিয়তির সঙ্গে অভিসার। সত্যি তাঁর অশেষ পাণ্ডিত্য ইত্যাদি বিষয় গুলোই উঠে এল।

কিন্তু সংবিধান প্রনয়নী কমিটি, আম্বেদকরের সভানেতৃত্বে কীভাবে সংবিধানটি রচিত হয়েছিল? কন্সটিটিউইয়েন্ট অ্যাসেম্বলিতে সদস্যরা বিশেষ করে অতি উঁচুমানের নেতারা কে কীভাবে তাঁদের বক্তব্য রেখেছিলেন, তার গুরুত্বপূর্ণ একটা দুটো পংক্তির কথাও কেউ উল্লেখ করলেন না। একটা পূর্ব রচিত খসড়া- যেটার ওপর ব্রিটিশ রাজ প্রণীত ১৯৩৫ সালের শাসনতন্ত্রের মোটা দাগের ছাপ পড়েছিল তাই নিয়ে বিতর্ক শুরু হয়। বাবা সাহেব প্রায় পণ্ডিতসেরা ব্যক্তিত্ব, আইনজ্ঞ এবং বিশেষ প্রতিভাশালী। দিনের পর দিন প্রতিটি সদস্যের বক্তব্য শুনেছিলেন। সর্বসাকুল্যে সাত হাজারেরও অধিক সংশোধনী প্রস্তাব এসেছিল যার প্রায় প্রতিটি সংশোধনীর গুরুত্ব ছিল অনস্বীকার্য।

বাবাসাহেব আম্বেদকরের শ্রেষ্ঠত্ব এইখানেই যে তিনি তাঁর প্রতিভার ছাঁকুনিতে সাত হাজার সংশোধনীকে মান্যতা দিয়ে এক একটি অনুচ্ছেদ গড়েপিঠে সংস্কার করে সংবিধানের শেষ খসড়াটি রচনা করে কন্সটিটিউইয়েন্ট অ্যাসেম্বলিতে পেশ করেছিলেন। সেটি পাশ হয়ে গৃহীত হয়েছিল সেই স্বাধীনতার পরবর্তী প্রায় দুবছর পরে। ১৯৪৬ সালের নভেম্বরের ৯ তারিখে যে অধিবেশন শুরু হয়েছিল সেখানে একই সঙ্গে দুটি কাজ শুরু হয়েছিল। কন্সটিটিউইয়েন্ট অ্যাসেম্বলি একই সঙ্গে দুটি কাজ করতো। অর্থাৎ তার কন্সটিটিউইয়েন্ট পাওয়ার বা ক্ষমতার দ্বারা সংবিধান রচনা করা আর আইন প্রনয়নী ক্ষমতার দ্বারা সংবিধান রচনা করা আর আইন প্রনয়নী ক্ষমতার দ্বারা কেন্দ্রীয় আইন সভার দায়িত্ব পালন করা। শেষ পর্যন্ত কন্সটিটিউইয়েন্ট পাওয়ার বা ক্ষমতা পরিচালিত হয়েছিল ১৯৪৬ সালের নভেম্বরের ৯ তারিখ থেকে নভেম্বরের ২৬ তারিখ অবধি। পরে ১৯৫০ সালের, অর্থাৎ মাত্র কয়েক মাস পরে, ২৬শে জানুয়ারি ১৯৫০ সংবিধান অনুমোদিত ২৬শে জানুয়ারি স্বাধীন সার্বভৌমত্ব সম্পন্ন একটি সাধারণতন্ত্রে পরিণত হয়ে গেল। কিন্তু তার আগে পর্যন্ত ভারতবর্ষ ব্রিটেনের ডোমিনিয়ান স্ট্যাটাসে শাসন কুকার ক্ষমতার শীর্ষে ছিল মাউন্ট ব্যাটেন সাহেব ভারতের ব্রিটিশ ভাইসরয় হিসাবে।

দুই কক্ষে অসংখ্য বক্তা আম্বেদকরের শ্রেষ্ঠত্ব নিয়ে অক্ষরের পর অক্ষর সাজালেন। কিন্তু কন্সটিটিউইয়েন্ট অ্যাসেম্বলিতেএবং তার ভূমিকা কীভাবে আম্বেদকরের ড্যাফটিং কমিটিতে সভাপতির স্বীকৃতি পেলেন সেগুলো কিন্তু দৃষ্টিগ্রাহ্যভাবে সংসদের অধিবেশনে গুরুত্বপূর্ণভাবে লিখিত হলো না। এইসমস্ত বক্তব্যই বলা হলো লোকসভা এবং রাজ্যসভার টেলিভিশনের সামনে বসে এই প্রতিবেদকের অখণ্ড সময় ব্যয়ের দ্বারা। অতএব কোথাও কোন ভুলভ্রান্তি থাকলে সেটা প্রতিষেদকের সাময়িক অমনোযোগিতার ফল। দায় তার নিজের। ভারতের জাতীয় কংগ্রেস প্রায় একক এবং অবিচ্ছিন্ন ভাবে স্বাধীনতার আন্দোলন করেছে।

কংগ্রেস সত্যিকারের একক মার্শ পার্টি বা জনগণের দলে পরিণত হয়েছিল কংগ্রেস গান্ধির নেতৃত্বে। এতবড় দীর্ঘ জীবনে সব আন্দোলনেই যে তিনি স্বার্থক হয়েছিলেন তা নয়। পেছনে ফিরে তাকালে দেখা যাবে তিনিও বহু ভুল ভ্রান্তি করেছেন। প্রায়শই গোষ্ঠীতন্ত্রে তাঁর নেতৃত্বে বড় হয়ে উঠেছিল। বাংলার কংগ্রেস পার্টি কেন, সাধারণ মানুষের একটা বড় অংশও গান্ধিজীকে প্রাণের নেতা বলে মান্যতা দেয়নি। কিন্তু শান্তিপূর্ণ জাতীয় আন্দোলনে তাঁকে পুরোহিত বলে মেনে নিয়েছে। প্রতিবাদী সুভাষও গান্ধিবাদে অবিশ্বাসী থেকেও বিদেশে গিয়ে গান্ধিকে ‘জাতির জনক’ আখ্যা দিয়েছিলেন। আজও আমরা যা বলে থাকি। গান্ধিজি তাঁর ধর্মবিশ্বাসে স্থির থেকেও অন্য ধর্মের প্রতি কোন রকম অশ্রদ্ধা দেখাননি। একটা জিনিস অবশ্যই সত্য, তিনি শেষপর্যন্ত (শেষে অনেককিছুই নীরবে স্বীকার করে নিলেও) এক অখণ্ড ভারতই নয়, একটা ধর্ম নিরপেক্ষ রাষ্ট্র চেয়েছিলেন। জিন্নাহ সাহেব বহু সময়ই তাঁকে অগ্রাহ্য করলেও গান্ধীজীর এই বাসনাকে মনে মনে, কার্যত অবশ্যই নয়, মেনে নিতেন।

আর একজন দলিত সম্প্রদায়ের অসামান্য নেতা গান্ধিজীকে পছন্দ করতেন না। তিনি দলিত সম্প্রদায়ের ফেডারেশনের নেতা বাবা সাহেব আম্বেদকর। ১৯৩২ পুনা চুক্তির পরিপ্রেক্ষিতে এই কথা প্রমান করে। মানুষ হিসেবে বিভিন্ন মানুষ, বিভিন্ন দলের কাছে তিনি ভিন্ন রূপে ছিলেন। গান্ধি অনশন এবং তাঁর প্রতিশ্রুতির জন্য বাবা সাহেব আম্বেদকার নরম হয়ে গান্ধির প্রতি শ্রদ্ধা দেখান। কিন্তু একজন সেরা রাজনীতিক হিসাবে তিনি প্রথমসারির প্রথমই থাকলেন।

কন্সটিটিউইয়েন্ট অ্যাসেম্বলির ড্যাফটিং কমিটির সকলেই কংগ্রেসের সদস্য থাকলেও তিনি বাবাসাহেবকে তাঁর সভাপতি করেছিলেন-এটা ছিল বাবাসাহেবের আইনগত অসামান্য প্রতিভার স্বীকৃতি। বাবাসাহেবের কোন বিশেষ জনভিত্তি না থাকলেও প্রথম বাংলা থেকে, স্বাধীনতার পরে বাংলায় তাঁর সদস্যপদ খারিজ হলেও, বম্বে থেকে জিতিয়ে আনা হয়েছিল। সংসদের বক্তৃতায় এসব কথার উল্লেখ পশ্চিমবাংলা তৃণমূল কংগ্রেসের কেউ কেউ উল্লেখ করেছেন। সংবিধান দিবস হিসাবের আলোচনা সংসদের সময় এবং খরচ একদিনই বোধহয় যথেষ্ট ছিল। সাহেবের জন্মদিন সংক্রান্ত অনুষ্ঠান ঠিক সময়ে সেন্ট্রাল হলে দুইকক্ষের সদস্য নিয়ে করা যেত।

মনে হয় এই বিষয়ের ওপর অবশ্যম্ভাবী শেষ বক্তা প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মদির কথা উল্লেখ করা প্রয়োজন। শেষ বক্তা হিসেবে তিনি বাবাসাহেব আম্বেদকর তো বটেই গান্ধিজির নামও উল্লেখ করেছেন সজোরেই। এর একটা কারণও ছিল। পাঞ্জাবের এক শিখ বক্তা – অবশ্যই কংগ্রেসের নন, অসাধারণ ইংরেজিতে প্রথমেই বললেন সরকার তাঁদের মত করে ভালো কাজই করলেন। ভারতবর্ষের প্রধান “আইকন” (নাম করেননি। তবে অবশ্যই গান্ধিজী) যিনি তাঁকে, একটু পেছনে ফেলে নতুন “আইকন” তৈরির চেষ্টা আর কি! ভালোইতো।

ঠিক তাঁর পরের বক্তা স্মৃতি ইরানি। নিজেই বললেন তিনি,“ মানবসম্পস উন্নয়ন মন্ত্রী হিসাবে বলছি এই ধরনের কোন ভাবনা সরকারের মাথায় থাকতেই পারে না”। অবশেষে স্মৃতি ইরানিকে সমর্থন করে নরেন্দ্র মোদী বলতে ওঠেন। গান্ধীজীর ভূমিকা নিশ্চয়ই উল্লেখযোগ্য। কোন একজনকে আইকন সৃষ্টির উদ্দ্যেশ্যে সংবিধান দিবস এবং বাবা আম্বেদকরের ১২৫ তম জন্মশতবার্ষিকী পালিত হচ্ছে না। জাতির যা করনীয় আমাদের সরকার পরিচালিত সংসদ ঠিক সেই কমিটিই করছে। অবশ্যই প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের সারবত্তা মেনে নেওয়াই উচিত। আর আমজনতা সম্ভবত তাই করলো।

< Back to List

 
Comments (0)
 
 
Post a Comment Comments Moderation Policy
 
Name:    Email:
 
Comment:
 
 
 
Security Code:
(Please enter the security code shown above)
 

Comments and Moderation Policy

MaaMatiManush.tv encourages open discussion and debate, but please adhere to the rules below, before posting. Comments or Replies that are found to be in violation of any one or more of the guidelines will be automatically deleted.

  • Personal attacks/name calling will not be tolerated. This applies to comments or replies directed at the author, other commenters or repliers and other politicians/public figures. Please do not post comments or replies that target a specific community, caste, nationality or religion.

  • While you do not have to use your real name, any commenters using any MaaMatiManush.tv writer's name will be deleted, and the commenter banned from participating in any future discussions.

  • Comments and replies will be moderated for abusive and offensive language.

×

© 2017 Maa Mati Manush About Us  |  Contact   |   Disclaimer   |   Privacy Policy   |   Site Map