M3 Views

জননেত্রী মমতা নির্বাচনী প্রচারে যখন ঝড়ের পাখি

অমিয় চৌধুরী  | July 5, 2016

২০১৬ র সরকার গঠন করবার পর প্রশাসনিক প্রধান হিসেবে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় একদিনও বসে থাকেননি। প্রথম জেলা সফর করতে প্রথমেই চলে গেলেন জঙ্গলমহল অঞ্চলে। সর্বোচ্চ নেতৃত্বের এই হল চরিত্রগত দলীয় বৈশিষ্ট্য। তৃণমূলের এই জয় আলোড়ন সৃষ্টিকারী। একথা সত্যিকারের বুদ্ধিজীবী, এমনকি বিরোধী শিবিরের কটু কাটব্যে অভ্যস্ত নেতারাও বলতে বাধ্য হয়েছিলেন।

যদিও কিঞ্চিত ঢোক গিলে। জনমত ঘোষিত হওয়া থেকে শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠান সবই ছিল ঐতিহাসিক। ভারতবর্ষের রাজ্য রাজনীতিতে এমনটা আগে কখনো ঘটেনি। কেননা এই নির্বাচনটি প্রকৃত অর্থেই অতি নিচুতলা থেকে সর্বোচ্চ তলা অবধি গণতান্ত্রিক, চরম প্রশংসিত নিরপেক্ষ এবং নির্ভীক। নির্বাচন শেষে সব বিরোধী দলই দ্বিধাহীনভাবে প্রশংসা করেছে। আর করতে হয় বলেই এক একটা দফা নির্বাচন শেষে শয়ে শয়ে মিথ্যা, বানানো আর নির্বাচন কমিশনকে বিব্রত করার উদ্দেশ্যেই অভিযোগ জমা করেছে। কমিশন অবশ্য এক দু ঘণ্টার মধ্যে সমস্যার সমাধান করে দিয়েছে। কিছু সংবাদপত্র আর বাজারি টিভি চ্যানেলই হয়ে উঠেছিল মিথ্যা আর সত্য প্রচারের আসল বিরোধী পথ।

এখন আবার নিজের সুখ বাঁচানোর জন্য সূর্যকান্ত মিশ্র দলের কেন্দ্রীয় কমিটির সামনে আমতা আমতা করে বলতে চেয়েছেন - সুষ্ঠু নির্বাচন যা আশা কড়া গিয়েছিল তা হয়নি। এমন কথা এখন বললে আর মুখ বাঁচবে! সেটা উনিও খুব ভালো করে জানেন। সূর্যকান্ত ওই জাতের নেতা নন যার কথায় আপামর জনতা উজ্জীবিত হয়ে ওঠে। কিন্তু যখন উনি কংগ্রেসের সঙ্গে জোট করে ওঁর নির্বাচনী এলাকায় দাঁড়িয়ে প্রথম দফা ভোটের পর জঙ্গলমহল এলাকায় দাঁড়িয়ে ডবল সেঞ্চুরি হাঁকাচ্ছেন তখন কিছু মানুষ হৈ চৈ করল। নির্বাচনী দফাগুলো যত এগোল শহরে বুদ্ধিজীবীরা - যারা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে গায়ের জোরে পাত্তা দিতে চান না, তাঁরা ভেবে বসলেন এবার কংরেড এর রাজত্ব শুরু হতে চলেছে। যারা শহরে সুবিধাভোগী সমপন্থী তারাও ধন্দে পড়লেন। বিশেষত যখন বাজারী 'কিল-ইয়েলসন' সমীক্ষা করে বললো - তৃণমূল ১৫১-১৫৩ টি আসনের বেশি পাবে না। ৩০-৩১ টা সিটে একটু সন্দেহ আছে। এদিক ওদিক হলেই তৃণমূল কংগ্রেস নেমে আসবে ১২১ আসনে। বুঝুন অবস্থা। প্রকৃত সমীক্ষায় যখন তৃণমূলই উঠে আসছে। তৃণমূল কংগ্রেস পাবে কম বেশি দুশো আসন, তখন বাজারী সমীক্ষা ( 'কিল-ইয়েলসন' সত্যি ওরা বাজার সমীক্ষা করে থাকে। অর্থাৎ কেমন করে চাল ডাল তেল শেয়ার বাজার ওঠানামা করে) কংরেডীয় প্রচার যন্ত্র আম জনতার সামনে নেতাদের কল্কে সাজাচ্ছে। আর অন্যদিকে তৃণমূলের গ্রহণযোগ্যতা বেড়েই চলেছে। কংরেডীয়দের পায়ের নিচের মাটি বালির মত সরে যাচ্ছে। ওরা বুঝতেও পারে নি।

নিমতলা ফ্লাইওভার দুর্ঘটনার পরে কলকাতার কয়েকটি আসন সম্বন্ধে তৃণমূলের কিছু নেতাও যথেষ্ট বিষণ্ণ হয়ে পড়েছিলেন। আর তার সঙ্গে চলছিল আনন্দ জগত সহ প্রায় টিভি চ্যানেলে বোদ্ধাদের মাতব্বরী। নারদা কাণ্ডের নির্বাচনী প্রভাব নিয়ে সান্ধ্য বাসরে মেহফিল বসিয়ে দিয়েছেন। সব নিউজ পেপার ভিউজ পেপারে পরিণত। বাড়ির পুরুষরা টিভি খুলে যখন এইসব ছাই ভস্মে মগ্ন তখন মহিলারা তাদের প্রাত্যহিক সিরিয়াল দেখতে না পেরে যারপর নাই বিরক্ত। এইখানে একটা কথা বলে রাখা ভালো। প্রকৃত সমীক্ষকরা দেখেছেন এবারের এই ভোটে কী গ্রাম কী শহর মহিলারা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে ঢেলে ভোট দিয়েছেন। এবং অবশ্যই গ্রামের মানুষের প্রায় ৭০ শতাংশ ভোট পড়েছে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের পক্ষে। শহরই বা নাই কেন! ভেঙে পড়া ফ্লাইওভারে দুর্নীতির গন্ধ বিস্তারে দুহাত তুলে বিজেপির রাহুল সিনহা জোড়াসাঁকোর আসনটা যখন প্রায় কব্জা করে ফেলেছেন ভাবলেন, তখন ওই আসনে ভোট পড়ে মাত্র ৫৩ শতাংশের কিছু বেশি। কপাল চাপড়ে রাহুল দেখলেন অতি অনায়াসে তৃণমূলের প্রতিনিধি দিতে গেলেন। কলকাতার একটা আসনেও (১১টি) বিজেপি বা কংরেড দাঁত ফোটাতে পারলো না। এত প্রচণ্ড 'হাইপ' তুলেও কংরেড জোট এবং 'ভাগ মদন, ভাগ মুকুল, ভাগ মমতা' শ্লোগানের উদ্ভাতা, লালবাহাদুর শাস্ত্রীর অপগণ্ড নাতি ধরাশায়ী হলেন। এলেন আর এক নেতা বিজয় বর্গীয়। অবশ্য বিজয় পেলেন তিনটি নরুন । তাও অবশ্য বেশিই। সিপিএম নেতা ছক্কা মারতে গিয়ে তৃণমূল পার্টির নেত্রী মমতার স্নেহ ভাজন শুভেন্দুর প্রথম দুসরাতেই সূর্যকান্তের মিডল স্টাম্প উপড়ে গেল। মমতার কথাই মান্যতা পেল। সিপিএম অক্কা পেল। আর তাদের শায়িত দেহের ওপর ভর করে কংগ্রেস ৪২ থেকে ৪৪-এ পৌঁছল। অথচ হওয়ার কথা ছিল সিপিএম ৫৪ আর কংগ্রেস ৪২ থেকে নেমে মাত্র ২২। সিপিএমের গৃহদ্বন্দ্ব এখন সর্বদল বিদিত। তার ওপর আবার বামফ্রন্টের শরিক দলের সঙ্গে তীব্র মতানৈক্য। উঠে দাঁড়াতে পারলেও সময় লাগবে। আর কংগ্রেসের নেতৃত্বের সংকটে এই রাজ্যে ওদের ভাঙ্গন অনিবার্য। বিশেষত তৃণমূলের একক নেতা এবং জনগনেরমমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তার অদম্য প্রাণশক্তির আধারে নির্বাচনী প্রচারে হয়ে উঠেছিলেন যখন এক ঝড়ে পাখি।

মুখ্য নির্বাচন কমিশন আপাত দৃষ্টিতে এতটাই সন্ত্রস্ত ছিলেন যে সমস্ত নির্বাচন পর্ব শেষ করতে তিন মাস সময় নিয়েছিলেন বিশেষত এই রাজ্যে। নির্বাচন ঘোষিত হলে মার্চ ৪ আর তার দুদিনের মধ্যে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ২৯৪ টি আসনে তৃণমূলের প্রার্থী ঘোষণা করে দিলেন। গত সাড়ে চার বছরে কাজের খতিয়ান সহ আগামীর প্রস্তাব, প্রকাশ করলেন কয়েক দিনের মধ্যেই। নির্বাচন ঘোষণা হয়ে যাওয়ার ১৫/২০ দিন পর কংগ্রেস সিপিএম অবাস্তব জোট মানুষকে বিভ্রান্ত করতে একটা হাওয়া তুলল।

এক অল্প বয়স্ক অর্বাচীন অধ্যাপক বললেন মে ১৯ জোটকে জিতিয়ে তিনি তার কম্যুনিস্ট পিতা যিনি মৃত তার তর্পণ সাঙ্গ করবেন। কিছু মানুষ জোটের হাওয়ায় অর্থাৎ কুলোর বাতাসে আন্দোলিত হয়েছিল। কিন্তু তাকে ঝড়ের বেগে উড়িয়ে দিলেন মমতা। দুমাসে ১৫৯ জনসভা করলেন। লক্ষ লক্ষ মানুষ ভালোবাসার নেত্রী মমতাকে দেখতে রাস্তায় নামলেন। পড়ে দল বেধে বুথে বুথে এসে ভোট দিয়ে গেলেন উৎসবের মেজাজে। শুধু মাঝে মাঝে বাঁধার সৃষ্টি করেছিল কেন্দ্রীয় আধাসামরিক বাহিনীর বুটের আওয়াজ। সব প্রতিকূলতা অগ্রাহ্যই করেছে মানুষ। বিরোধীরা আমাদের মত ঘিলুবিহীন মোরগরা সন্ত্রাস সন্ত্রাস বলে চিল চিৎকার করলেও সাধারণ মানুষ কিন্তু এই অপপ্রচার ভোলেনি। কেননা ঝড়ের পাখি হয়ে মমতা ছুটে বেরিয়েছিলেন মানুষেরই একজন হয়ে পশ্চিমবঙ্গের প্রান্তরে প্রান্তরে।

< Back to List

 
Comments (0)
 
 
Post a Comment Comments Moderation Policy
 
Name:    Email:
 
Comment:
 
 
 
Security Code:
(Please enter the security code shown above)
 

Comments and Moderation Policy

MaaMatiManush.tv encourages open discussion and debate, but please adhere to the rules below, before posting. Comments or Replies that are found to be in violation of any one or more of the guidelines will be automatically deleted.

  • Personal attacks/name calling will not be tolerated. This applies to comments or replies directed at the author, other commenters or repliers and other politicians/public figures. Please do not post comments or replies that target a specific community, caste, nationality or religion.

  • While you do not have to use your real name, any commenters using any MaaMatiManush.tv writer's name will be deleted, and the commenter banned from participating in any future discussions.

  • Comments and replies will be moderated for abusive and offensive language.

×

© 2017 Maa Mati Manush About Us  |  Contact   |   Disclaimer   |   Privacy Policy   |   Site Map