M3 Views

প্রাণ দেব, বাংলা ভাগ হতে দেব না

আর.এস.শেখর  | August 17, 2013

কংগ্রেস ৩০ জুলাই ঘোষণা করল তেলেঙ্গানা আলাদা রাজ্য হবে। বিমল গুরুঙ্গ জিটিএ থেকে পদত্যাগের একতরফা ঘোষণা করলেন। কারণ দেখালেন, রাজ্যের অসহযোগিতা। আর গোর্খা জনমুক্তি মোর্চা(গজমো) বলল, তেলেঙ্গানা হচ্ছে। আমাদেরও চাই গোর্খাল্যান্ড। বনবাংলো পুড়ল। স্কুল বন্ধ করে দেওয়া হল। অভিভাবকদের বলা হল, ছাত্রদের পাহাড় থেকে নিয়ে যেতে। পর্যটকদের আসা-যাওয়া নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হল। শুরু হল অনির্দিষ্টকালের বনধ্‌। এরপর হাইকোর্টের চরম নির্দেশ - জনজীবন স্বাভাবিক রাখতে হবে। জরুরি পরিষেবা সচল রাখতে রাজ্যকে ব্যবস্থা নিতে হবে, কোনও গুণ্ডামি বরদাস্ত যেন না করে প্রশাসন। অতএব, মূখ্যমন্ত্রীর আবেদন - বনধ্‌ প্রত্যাহার করে আলোচনায় বসুন। নইলে হাইকোর্টের নির্দেশমত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তারপরের পরিস্থিতি সবার জানা।

    মমতা ব্যানার্জী বলেছিলেন, তৃনমূল ক্ষমতায় আসলে ছ'মাসের মধ্যে পাহাড়ে শান্তি ও উন্নয়ন সুনিশ্চিত করতে সাংবিধানিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তিনি মূখ্যমন্ত্রীত্বের শপথ নিলেন ২০১১-র মে মাসে। মাত্র দুমাসে অর্থাৎ জুলাইয়ে ত্রিপাক্ষিক চুক্তি হল রাজ্য সরকার, কেন্দ্রীয় সরকার আর গজমো-র প্রতিনিধিদের মধ্যে। সহাস্য উপস্থিতি ছিল পি.চিদাম্বরম, বিমল গুরুঙ্গ এবং অবশ্যই মমতা ব্যানার্জীর।

    এরপর জিটিএ-র নির্বাচন হল। বিমলের অনু্রোধে তৃনমূল সব প্রার্থী তুলে নিল। গজমো শপথ নিল ২০১২-র অগাস্টে। ইতিমধ্যে মূখ্যমন্ত্রীর ঘনঘন পাহাড় সফর, একগুচ্ছ উন্নয়ন প্রকল্প ঘোষণায় পাহাড়বাসী আনন্দে মাতোয়ারা। লক্ষ লক্ষ পর্যটকের ভিড়ে শৈলাবাসে আবার প্রাণচাঞ্চল্য। এবার পাহাড় সত্যিই হাসছে। কিন্তু সেই হাসি মুছে দিয়ে শুধুমাত্র রাজনৈতিক মুনাফা লুটতে যে আরেকদল পৈশাচিক অট্টহাসিতে ফেটে পড়তে চায় তা কে-ই বা জানত ?

   গত শতাব্দীর আটের দশক থেকেই শুরু হয় সর্বনাশা এক বিভাজনের খেলা। আলাদা রাজ্য এবং আলাদা রাষ্ট্রের দাবি। অন্ধ্রপ্রদেশে চিত্রতারকা রামা রাওয়ের নেতৃত্বে তেলেগু দেশম পার্টি(টিডিপি)-র উত্থান। ক্রমশ শিবু সোরেনের নেতৃত্বে ঝাড়খণ্ড মুক্তি মোর্চা(ঝামুমো), মায়াবতী-মূলায়মের নেতৃত্বে বহুজন সমাজ পার্টি(বসপা) ও সমাজবাদী, প্রফুল্ল মোহান্তির অসম গণ পরিষদ(অগপ), বাদলের অকালি দল, নবীনের বিজু জনতা দল(বিজেডি), বাল থ্যাকারের শিবসেনা ইত্যাদি দলের অভ্যুত্থানে দেশের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে কংগ্রেসের দুর্গপতন ঘটল। কেন্দ্রে সরকার গঠনে একাধিপত্য, এমনকি জোট সরকারের নেতৃত্ব দেওয়ার ক্ষেত্রেও চরম অনিশ্চয়তা দেখা দিল। অতএব, যেখানেই আঞ্চলিক শক্তির উত্থান হচ্ছে সেখানেই আলাদা রাজ্যের দাবি মেনে নিয়ে শুরু হল বিভাজনের রাজনীতি। বিজেপি-ও একই পথ অনুসরণ করল। এসবের ফলশ্রুতিতে জন্ম নিল ঝাড়খণ্ড, ছত্তিশগড়, উত্তরাখণ্ড- এর মত নতুন রাজ্য। উত্তরপ্রদেশ, বিহার আর মধ্যপ্রদেশ দ্বিখণ্ডিত হল। এবার তেলেঙ্গানা। আর সঙ্গে আরও কুড়িটি নতুন রাজ্যের দাবি ইতিমধ্যে উঠেছে। গোর্খাল্যান্ড, অখণ্ড ঝাড়খণ্ড, কামতাপুরি, কার্বি আংলঙ, কুকিল্যান্ড, বুন্দেলখণ্ড, রোহিতখণ্ড, হরিৎক্ষেত্র, বিদর্ভ ইত্যাদি আলাদা আলাদা রাজ্য। পূর্ব-পশ্চিম, উত্তর-দক্ষিণ ভারত জ্বলছে। বলা হচ্ছে, এতদিন ঠিকঠাক উন্নয়ন হয়নি বলেই নাকি এসব দাবি উঠছে। তো পঞ্জাবে উন্নয়ন সবচেয়ে বেশী হয়েছে। সেখানে আলাদা খালিস্তান রাষ্ট্র(রাজ্য নয়)-র দাবি উঠেছিল কেন? তাছাড়া কংগ্রেস দেশ শাসন করছে কমবেশি পঞ্চান্ন বছর। পশ্চিমবঙ্গে দু'দফা যুক্তফ্রন্ট আর ৩৪ বছরের বামফ্রন্ট সাকুল্যে ৩৭ বছর বাংলা শাসন করেছে। কেন উন্নয়ন হয়নি ? ওরা জবাব দেবেন নাকি জবাব দেবেন মমতা ব্যানার্জীর দু'বছরের শিশু সরকার ? আর কেউ একজন দেখান তো দার্জিলিং-কালিম্পং-কার্সিয়াং এর মতো আধখানা জেলা, আধখানা লোকসভা আর তিনখানা বিধানসভা কেন্দ্র নিয়ে ভারতে কোনও রাজ্য হয়েছে অথবা এমন হাস্যকর দাবি উঠেছে? এসবকে গুরুত্ব দিলে আগামী দিনে 'সিটি স্টেট' বা নগর রাষ্ট্রের দাবী উঠবে না তো? যেমন ছিল প্রাচীন গ্রীসে। এথেন্স, স্পার্টা, আর্গোস, করিন্থ ইত্যাদি এক-একটি নগরী 'সার্বভৌম রাষ্ট্র'। স্বাধীন দেশ, আলাদা প্রশাসন, আলাদা মুদ্রা, পতাকা, আলাদা সেনাবাহিনী। তবে কি ভবিষ্যতে ভারত তেমনই নগর-রাষ্ট্রের পথে হাঁটবে?

   আর যদি প্রশ্ন উন্নয়নেরই হয় তাহলে একসঙ্গে উন্নয়নের পথে এগিয়ে যাওয়াই তো বাঞ্ছনীয়। ইতিহাসের ছাত্রেরা জানেন, দেশ যখন স্বাধীন হয় তখন ৫৬৫ টি দেশীয় রাজ্য(প্রিন্সলি স্টেট) ভারতের সঙ্গে সংযুক্ত হয়। যেমন কাশ্মীর-জয়পুর-জুনাগড়-কোচবিহার-কাথিয়াওয়ার ইত্যাদি ইত্যাদি। এখন যদি এ'সমস্ত দেশীয় রাজ্যের জনতা দাবী করেন উন্নয়ন হয়নি। অতএব, আমরা ভারতে থাকব না,(এই দাবি উঠছেও) কি জবাব দেবে কংগ্রেস-বিজেপি-সিপিএমের মতো আলাদা রাজ্যের প্রবক্তারা? আসলে উন্নয়ন এর ইস্যুটা জনতার নয়। বিধ্বস্ত, বিপর্যস্ত কংগ্রেস, বিজেপি, সিপিএমের। তাই ওরা বিভাজনের আগুন নিয়ে খেলেন। বিভাজনকে যারা রাজনীতির মুনাফা লোটার জন্য ইস্যু করছেন সেটি আসলে তর্কশাস্ত্রের ফ্যালাসি- তে দুষ্ট। তর্কশাস্ত্রের পরিভাষায় এই ধরণের 'অদ্ভুত কারণ' কে বলা হয় 'ফ্যালাসি অফ পোস্ট হক, আর্গো প্রপ্টার হক'। উদাহরণ, ধূমকেতুর উদয়ের পরে রাজার মৃত্যু হল। যারা ভাবলেন ধূমকেতুই রাজার মৃত্যুর কারণ, তারা এই ফ্যালাসি-তে দুষ্ট। দেশপ্রেমিক ভারতবাসী কি এমন ফ্যালাসি বা ধন্দে বিশ্বাস করবেন? মনে হয় না। কারণ, জাতীয় ঐক্য-সম্প্রীতি আর ভৌগোলিক অখণ্ডতার জন্যই তো আমাদের পূর্বপুরুষেরা আত্মত্যাগ করেছেন। তাঁদের সেই মহাকাব্যিক দেশপ্রেমের ধারা আজও লক্ষকোটি ভারতবাসীর হৃদয়ে সুপ্ত ফল্গুনদীর মতো বইছে, বইবেও। মমতা ব্যানার্জীও সেই ধারায় অবগাহন করেছেন। তাই বলতে পারেন- 'প্রাণ দেব, বাংলা ভাগ হতে দেব না।'

 

[Read previous post on খেলা ভাঙার খেলা >>]

< Back to List

 
Comments (0)
 
 
Post a Comment Comments Moderation Policy
 
Name:    Email:
 
Comment:
 
 
 
Security Code:
(Please enter the security code shown above)
 

Comments and Moderation Policy

MaaMatiManush.tv encourages open discussion and debate, but please adhere to the rules below, before posting. Comments or Replies that are found to be in violation of any one or more of the guidelines will be automatically deleted.

  • Personal attacks/name calling will not be tolerated. This applies to comments or replies directed at the author, other commenters or repliers and other politicians/public figures. Please do not post comments or replies that target a specific community, caste, nationality or religion.

  • While you do not have to use your real name, any commenters using any MaaMatiManush.tv writer's name will be deleted, and the commenter banned from participating in any future discussions.

  • Comments and replies will be moderated for abusive and offensive language.

×

© 2017 Maa Mati Manush About Us  |  Contact   |   Disclaimer   |   Privacy Policy   |   Site Map