M3 Views

দৃষ্টিপাত: অথ ২০১৩র পঞ্চায়েত নির্বাচনী কথা

অমিয় চৌধুরী  | August 16, 2013

২০১৩ পঞ্চায়েত নির্বাচন নিয়ে বিগত প্রায় একবছর ধরে জলঘোলা বড় কম হয়নি। সৌজন্যে অবশ্যই এই রাজ্যের নির্বাচন কমিশনার শ্রীমতী মীরা পাণ্ডে। এর আগের রাজ্য নির্বাচন কমিশনারদের সঙ্গে বামফ্রন্ট বিশেষ করে সিপিএম এবং মূখ্যমন্ত্রীদের মতপার্থক্য হয়নি। তার কারণ এখন আর বিশ্লেষণ করার প্রয়োজন নেই। একান্ত অনুগত অবসরপ্রাপ্ত বড় আমলা কূল তাদের অবসর গ্রহণের প্রাক্কালে চাকরি আরও তিন বছর করে বাড়িয়ে নিয়েছেন। সবসময়ই ঝামেলা এড়িয়ে গিয়েছেন।কাজ করিয়ে নিয়েছেন কমিশনের সচিবদের দ্বারা। এমনকি সাংবাদিক বৈঠকেও নেতৃত্ব দিয়েছেন সচিবরাই। এবার কিন্তু তা হয়নি। চৌত্রিশ বছর রাজ্য পরিচালনা করেছে বামফ্রন্ট সম্পূর্ণভাবেই তাদের নিজস্ব কায়দায়। সচেতন নাগরিক সেটা হাড়ে হাড়ে অনুভব করেছেন। আবার বামফ্রন্ট কে ফিরে আসতে হবে অতি দ্রুততায়। এই ভাবনা থেকেই সরে যাবার প্রাক্কালে তারা পশ্চিমবঙ্গকে উপহার দিয়ে গিয়েছে অতিসক্রিয় এক নির্বাচন কমিশনার। অতিসক্রিয় এক নির্বাচন কমিশনার! কিন্তু কাজের বেলায় অষ্টরম্ভা। এই কথা বলার কারণ ওঁকে ব্যক্তিস্তরে আক্রমণ নয়। ২০০৯ সালের পর থেকে তৃণমূল কংগ্রেস এবং কংগ্রেসের প্রেম ভালোবাসা আর ঘৃণা অথবা সঠিক করে বললে রাজনৈতিক অনতি অতীতের আকর্ষণ বিকর্ষণের ইতিহাস সবার জানা। ২১শে জুলাই এর শহিদ স্মরণ মঞ্চ থেকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ঘোষণা করেছিলেন পঞ্চায়েত নির্বাচনে তৃণমূল কংগ্রেস একক ভাবে লড়বে। উনি এটাও চেয়েছিলেন যে শীতকালে সম্ভব হলে নভেম্বর-ডিসেম্বর মাসেই ২০১৩র নির্বাচন হয়ে যাক। এইখানে কংগ্রেস সহ বামফ্রন্ট একটা কুযুক্তি করল। জানুয়ারী মাসে ভোটার তালিকার সামারি রিভিশন না করে নির্বাচনে গেলে বেশ কয়েক লক্ষ নতুন ভোটার যাদের বয়স জানুয়ারীতে ১৮ বছর হবে তারা ভোটদানে সমর্থ হবেনা। এই যুক্তিটার নিশ্চয়ই গ্রাহ্যতা আছে। আর একটা যুক্তি যেটা দেখানো হয়, সেটা অবশ্যই অপযুক্তি। জ্ঞানত বা অজ্ঞানতা প্রসূত। বিরোধী দলের জ্ঞানী প্রবররা আর টেলিভিশনের তার্কিকরা তারস্বরে মত প্রকাশ করলেন - স্থানীয় সরকার সে পঞ্চায়েত হোক বা পৌরসভাই হোক, প্রতিনিধিরা নির্বাচিত হন পাঁচ বছরের আয়ুষ্কাল নিয়ে। পাঁচ বছর পূর্ণ না হলে জন প্রতিনিধিদের সরিয়ে দেওয়া যায় না। নতুন প্রতিনিধিরা যারা নির্বাচিত হবেন, তারা তো কোন সংস্থায় অংশগ্রহণ করতে পারবেন না। তাঁদের অপেক্ষা করতে হবে সেই ২০১৩ সালের জুলাই মাস অবধি। অপেক্ষা করতে হবে নিকম্মা হয়ে। অতএব রাজ্য সরকারকে সুবিধে করে দেওয়া যায় না। এই কথাটি হয়ত মীরা পাণ্ডেজীও ভেবে থাকবেন। সাংবিধানিক আইন, রাজ্য সরকারের নয়, অনুধাবন করলে দেখা যাবে অন্য তথ্য। রাজ্য সরকার মনে করলে, নির্দিষ্ট কারণে - সে দুর্নীতিগ্রস্ত, অকর্মণ্য বা অন্য কারন দেখিয়ে যে কোন পৌরসভা বা গ্রামীণ ত্রিস্তরীয় পঞ্চায়েত যে কোন স্থানীয় সরকারকে বরখাস্ত করতে পারে। তবে শর্ত হল - বরখাস্ত করবার ছ'মাসের মধ্যে পুননির্বাচন করতে হবে। এবারের এই অষ্টম পঞ্চায়েত নির্বাচনে - এই কথাটাই গুলিয়ে দেবার চেষ্টা করা হয়েছে। এখানে নির্বাচন কমিশনার ইচ্ছাকৃত প্রয়োজনে চুপচাপ থেকেছেন। এই কথাটাও নির্বাচন কমিশন এর জানা থাকা উচিৎ। সেই নির্বাচন কমিশনার - যিনি উঁচুস্তরের আমলা হিসেবে বামফ্রন্ট সরকারের ধমক ধামক এবং কাজের প্রক্রিয়ায় প্রশাসনিক স্তরে অংশগ্রহণ করে আসছেন। কবে নির্বাচন শুরু হবে সেটা কিন্তু সবক্ষেত্রেই সরকারই মোটামুটি একটা তাদের সুবিধে মতোই 'টিক' দিয়ে থাকে। সর্বক্ষেত্রেই সে স্থানীয় স্তরে এবং কেন্দ্রীয় স্তরের সরকারের ঐতিহ্য। রাজ্য-নির্বাচন কমিশনার এটা মানতে চাননি। তাঁর নিজস্ব কারণে অথবা 'ভদ্দরলোক' সম্প্রদায়ের মনোকাঠামোয় বন্দি থেকে। 'সাবওলটার্ন' এর প্রতিনিধি তৃণমূল কংগ্রেসীদের সম্ভাব্য বিপুল জয়কে যদি কিছুটাও আটকে দেওয়া যায়!

পরবর্তী ধাপে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় - এর নেতৃত্বে সরকার যখন মানুষের সুবিধার্থে ফেব্রুয়ারীর শেষে বা মার্চে নির্বাচনের দাবি জানালেন, মাননীয়া কমিশনার শ্রীমতি পাণ্ডে বললেন - ভোটার তালিকা প্রস্তুত হয়নি। ব্যাপারটা দেখুন যে কমিশন দু'মাস সময় পেয়েও ভোটার তালিকার সামারি রিভিশন করতে পারলেন না সেই কমিশনার তো উদ্দেশ্য প্রণোদিত, কুঁড়ে অথবা অপদার্থ। সে যাই হোক ঝড় এল ভরা বর্ষায় এবং তাঁর মর্জিমতোই পাঁচ দফায় এবং কেন্দ্রীয় বাহিনীর সাহায্যে ১৮ দিন ধরে নির্বাচন যজ্ঞ সমাপ্ত করলেন। অবশ্য এখানে নির্বাচন কমিশনার মীরা পাণ্ডে ইন্‌স্ট্রুমেন্টাল মাত্র। ভোট করিয়েছে বিচার ব্যবস্থার সর্বোচ্চ্য সংস্থা সুপ্রিম কোর্ট। মীরা পাণ্ডে তাঁর সাংবিধানিক পদমর্যাদা ভুলে আবারও ভোটের সাহায্য নিয়ে ১৩টি পৌরসভার নির্বাচনে সরকারের ইচ্ছার কোন মর্যাদা না দিয়ে আবারও কোর্টের আদেশের দ্বারা পৌর নির্বাচন এর ভোট ৭ই সেপ্টেম্বরের পরিবর্তে সেপ্টেম্বরের চতুর্থ সপ্তাহের ২১ এবং ২২ তারিখে করাচ্ছেন। গনতন্ত্রের পক্ষে নির্বাচন কমিশনারেরা এমনকি আদালতের অতি সক্রিয়তায়ও গনতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় শুভ নয় নিশ্চয়ই। নির্বাচিত সরকারকে কিন্তু দায়বদ্ধ থাকতে হয় জনগণের প্রতি। আর অন্য প্রতিষ্ঠানগুলির দায় দায়িত্ব সরকারের প্রতি, কেননা তারা সরকারের দ্বারাই মনোনীত।

যাক যার শেষ ভালো সেটা অবশ্য বাঞ্ছনীয়। এই পঞ্চায়েত ভোটে প্রায় তিনটি স্তরেই মমতা সুনামিতে সিপিএম সহ ১২৭ বছরের কংগ্রেস দল উড়ে গেছে। এই পঞ্চায়েতের আসন সংখ্যা তৃণমূল দলকে বলে দিচ্ছে আগামী সংসদীয় নির্বাচনে একা লড়লেও ৩০টা আসন আয়ত্তে আনতে পারবে। পঞ্চায়েতের গণনা শেষে সাংবাদিক সম্মেলন করে কমিশনার বললেন মিশ্র অবস্থা থাকলেও ভোট পর্ব যথেষ্টই অবাধ এবং শান্তিপূর্ণ ছিল। অথচ বিরোধীরা যারা অভিযোগ তুলছেন ভোট অবাধ হয়নি, তৃণমূলের জয় ছাপ্পা ভোটের জয়, যার সমস্ত দায় এবং দায়িত্ব নির্বাচন কমিশনের অকর্মণ্যতা। অথচ এরাই নির্বাচন কমিশনকে তোল্লাই দিয়ে যাচ্ছিলেন। মীরা পাণ্ডে সাহেবা একবার ভেবে দেখবেন মার্চ মাস নাগাদ ভোট হলে নির্বাচনী হিংসার বলি আরও কিছু কম থাকতো।

[Read previous post on দৃষ্টিপাত >>]

< Back to List

 
Comments (0)
 
 
Post a Comment Comments Moderation Policy
 
Name:    Email:
 
Comment:
 
 
 
Security Code:
(Please enter the security code shown above)
 

Comments and Moderation Policy

MaaMatiManush.tv encourages open discussion and debate, but please adhere to the rules below, before posting. Comments or Replies that are found to be in violation of any one or more of the guidelines will be automatically deleted.

  • Personal attacks/name calling will not be tolerated. This applies to comments or replies directed at the author, other commenters or repliers and other politicians/public figures. Please do not post comments or replies that target a specific community, caste, nationality or religion.

  • While you do not have to use your real name, any commenters using any MaaMatiManush.tv writer's name will be deleted, and the commenter banned from participating in any future discussions.

  • Comments and replies will be moderated for abusive and offensive language.

×

© 2017 Maa Mati Manush About Us  |  Contact   |   Disclaimer   |   Privacy Policy   |   Site Map