M3 Views

দৃষ্টিপাত: তৃনমূল কংগ্রেস-এর উত্থান মমতা-নেতৃত্বের প্রজ্বলন

অমিয় চৌধুরী  | August 17, 2013

সেই আশির দশকের প্রথম দিন থেকেই এক অদ্ভুত ধরণের চিন্তা মনে কাজ করতো। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তখনো রাজনীতির বড় প্রাঙ্গনে আসেননি। জনতা পার্টির অতি বৃদ্ধ নেতৃবর্গের অতিরিক্ত লোভ, একে অপরকে টেক্কা মারার প্রচেষ্টা, কিছুজনের একগুঁয়েমি,শাসন ক্ষমতা পরিচালনা করার অক্ষমতা আর তখন মধ্যবয়সী মধু লিমায়ের মতো নেতাদের দলবাজি, সমর গুহদের প্রতিশোধ স্পৃহাই তাদের অকালে খণ্ডিত করে দিল। ১৯৭৯ সালের অগস্ট মাস নাগাদ প্রধানমন্ত্রী মোরারজিভাই দেশাই অনাস্থা প্রস্তাবের মুখোমুখি হলেন। বড় আশা করেছিলেন জ্যোতি বাবুর নেতৃত্বে বামফ্রন্ট মোরারজি- সরকারকে সাহায্য করবে। জ্যোতিবাবু তখন পোল্যান্ডে বসে আলসে বিলাসে পলিশ বসন্ত উপভোগ করছেন। মোরারজিভাইকে কোন আশ্বাস দিলেন না। অথচ দেখুন এই জয়প্রকাশ নারায়ণ এবং জনতা পার্টির হাত ধরেই জ্যোতি বসুরা একদিন ক্ষমতায় গেঁড়ে বসেছিলেন। সঞ্জয় গান্ধীর ইন্দিরা কংগ্রেস কাঠের পুতুলের মতো রাজা চরণ সিংহকে পেয়ে গেছেন। মোরারজি দেশাই পদত্যাগ করলেন। কংগ্রেস তার ১৫৭ জন সদস্য নিয়ে চরণ সিংহকে বাইরে থেকে সমর্থন করলেন। কিন্তু কার্যকালে কংগ্রেস সমর্থন তুলেও নিল। চরণ সিংহের নেতৃত্বে গড়া দ্বিতীয় সংখ্যালঘু জনতা পার্টি সরকার পড়ে গেল। অতএব পরবর্তী নির্বাচনের আগে চরণ সিংহ, প্রধানমন্ত্রী হয়েও কোনদিন সংসদের মুখোমুখি হলেন না। এই ঘটনা সংসদীয় গনতান্ত্রিক ব্যবস্থায় এক বিরল ঘটনা। ১৯৮০ সালে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হল। ইন্দিরা গান্ধী বিপুল সংখ্যা গরিষ্ঠতা নিয়ে ক্ষমতায় ফিরে এলেন। আর এই সময় থেকেই কেন্দ্রীয় কংগ্রেস কর্তাদের সঙ্গে পশ্চিমবঙ্গে বামফ্রন্ট, বিশেষ করে সিপিএম এর পর্দার আড়ালে এক নতুন সখ্যতা গড়ে উঠল। ওদিকে ব্যক্তিগত স্তরে ইন্দিরাজি আবার জ্যোতি বসুর বন্ধু। ১৯৭৭ সালের নির্বাচনে বিধানসভা ভোটে বঙ্গীয় কংগ্রেস মাত্র ১৭টি আসন পেয়ে গো-হারান হারল। অনুমান করা গিয়েছিল ১৯৮২ সালের নির্বাচনে পশ্চিমবঙ্গে কংগ্রেস অন্তত বেশ কিছু আসন পাবে। কিন্তু তা কখনোই হলো না। এইভাবেই কংগ্রেস ১৯৯৬ সালের আগে পর্যন্ত গুটি কয়েক আসনেই সন্তুষ্ট থাকল। ১৯৮৪ সালের সংসদীয় নির্বাচনে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় রাজনীতির সর্বভারতীয় স্তরে পা বাড়ালেন।

রাজীব গান্ধী ক্ষমতায় এলেন আর সঙ্গে করে নিয়ে এলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়-এর মতো একমুখী লড়াকু আর সৎ রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বকে। রাজীব গান্ধীও মাঝে মাঝে জ্যোতি বাসুজীকে তোল্লাই দিয়ে বঙ্গীয় কংগ্রেস নেতাদের ক্ষীয়মাণ করে দিলেন ইচ্ছায় অথবা অন্য কোন গভীর কারণে। মমতা তো পরে এলেন। বঙ্গীয় কংগ্রেস নেতাদের ময়দান তো অন্য। রাজনীতির চেয়ে ব্যাক্তি স্বার্থেই তারা নির্ভরশীল।

আর ঠিক এই জায়গাতেই সন্দেহ। যা থেকে একটা তত্ত্ব মাথায় ঘুরতে লাগলো। অধ্যাপক পল্‌ ওয়ালেস এর সম্পাদিত বইয়ে পশ্চিমবঙ্গ সমন্ধে এই কথা বর্তমান লেখক বার বার লিখেছে। মুখে মুখে ফেরা ইতিহাস এবং অনুমান ভিত্তিতে লেখা হয়েছে তখন। একটা অলিখিত নিবিড় চুক্তি। সিপিএম, পশ্চিমবঙ্গে তোমরা করে কম্মে খাও। ওখানে কিছু আসন আমাদের দিলেও ঠিক আছে। কিন্তু কেন্দ্রীয় সরকারে থাকতে আমাদের ব্যাঘাত ঘটিওনা। এই মনোভাব নিয়েই কেন্দ্রীয় কংগ্রেস নেতৃত্ব বামফ্রন্টের সঙ্গে একটা পাঁচমালা রাজনৈতিক পরিকল্পনায় সুখী ছিল। এই নীতি অবশ্য পরবর্তী কালের সমস্ত কেন্দ্রীয় সংখ্যালঘু সরকারই অনুসরণ করে গেছে। এর মাঝে ১৯৮৪ সালে একরোখা, সংকল্পে দ্বিধাহীন, অনমনীয় মমতা ক্ষমতায় উঠে এলেন। কিন্তু প্রাদেশিক কংগ্রেস নেতারা তো তখন এক দেনা পাওনার হিসাবে মশগুল, কাঁকড়া মানসিকতায় আবর্তিত। এই প্রসঙ্গেই কংগ্রেস এবং সিপিএম-এর সখ্যতার প্রশ্ন। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যিনি তখন পশ্চিমবঙ্গের যুবকংগ্রেস নেত্রী এবং পরবর্তীতে নরসিমা রাও-এর মন্ত্রীপরিষদের মন্ত্রী। উনি 'উপলব্ধি' করেছিলেন -"কংগ্রেস রাজনীতিতে কেউ একটু বেশি সক্রিয় হলেই শক্ত হাতে তার রাশটাকে টেনে ধরে আমাদের ওপরতলার নেতৃত্ব। চুপচাপ শান্তশিষ্ট হয়ে ঘরে বসে ভালো, ভীষণ ভালো - ভাষণ দাও, নেতৃত্বকে রিপোর্ট পাঠাও, অর্থ কামাও আর কিছু ভাগ দাও- রাজনৈতিক কর্মসূচি বলতে এটাই। এবং এটাই বাস্তব।" গভীর এই অনুভবই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে একক চিন্তার অবকাশ দিয়েছিল। তারই ফলশ্রুতিতে ১৯৯৮ সালের ১ জানুয়ারী তৃনমূল কংগ্রেসের এক স্বতন্ত্র পার্টি হিসেবে আত্মপ্রকাশ। বঙ্গীয় কংগ্রেস নেতাদের দ্বারা কখনো প্রতারিত, কখনো বাধাপ্রাপ্ত হয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তার সত্যিকারের সহযোগী সঙ্গীদের নিয়ে তৃনমূল কংগ্রেস সৃষ্টি করেছেন। তাই তৃনমূল কংগ্রেস-এর উদ্ভব এবং মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বহুমুখী নেতৃত্বের বিকাশকে আলাদা করা যায় না। তিনি বহুবার সিপিএম-এর বর্বর আক্রমণের মোকাবিলা করেছেন জীবন মৃত্যুর সীমানায় দাঁড়িয়ে, বহু উত্থান পতনের মধ্যে দিয়ে। বহুবার রাষ্ট্রীয় উৎপীড়ন অগ্রাহ্য করেই না তিনি জনগণের নেত্রী হয়ে উঠেছেন। পারিবারিক সূত্র ধরে বা কোন বিশাল ব্যাক্তিত্বের প্রচ্ছায়ায় নয়। মমতা শুধুমাত্র নিজের ব্যাক্তিত্বগুনেই আজ তিনি গণমোহন ব্যক্তিত্বের অধিকারী। সিপিএম শাসিত পশ্চিমবঙ্গে কংগ্রেস যা কোনোদিন ভাবতে পারেনি সেই ১৯৭৭ সালের পর থেকে, মমতা একা তাই করে দেখিয়েছেন। মমতা নিজের মুখেই ব্যক্ত করেছেন সেই অনুভব। "আমি বুঝতে শিখলাম এই বাম-ডানের যৌথ মেথড্‌ আমাকে 'ফিট' করবে না।" শুরু হল আদর্শের সংঘাত। প্রনব মুখোপাধ্যায় নিজের উচ্চাভিলাস নিয়ে শুধু নিজেতে নিজে নিমগ্ন থেকেছেন। তার বুদ্ধি আর সোমেন মিত্রের অলক্ষ্য ষড়যন্ত্রে কংগ্রেস সভানেত্রী হওয়ার লড়াইয়ে মমতাকে হেরে যেতে হয়। অথচ এখন দেখুন টেলিভিশানে যা প্রত্যক্ষ করেছেন- চোখের জলের ধারায় গলা বুজে যাওয়া সোমেন বলেছিলেন- তিনি কংগ্রেস নেতৃত্বের দ্বারা প্রতারিত, অপমানিত। অতএব এখন ছোট বোন মমতাই ভরসা। তৃণমূলে ঢুকেই কিন্তু তৃনমূলের টিকিটে ডায়মন্ড হারবারের সাংসদ আর তার স্ত্রী শিয়ালদহ কেন্দ্রের বিধায়ক। তবে একথাও ঠিক বাজার চলতি রাজনীতিকদের কৃতজ্ঞতা বোধটা একটু কমই থাকে। দুই এনডিএর আমলেই মমতা জাতীয় রাজনীতিতে অপ্রতিহত হয়ে ওঠেন। কংগ্রেসকে তখনও মমতার চেনায় ভুল ছিল। তবে অবশ্যই ভুল ভ্রান্তি থাকলেও একমুখী, উদ্দেশ্য ও আদর্শে স্থির মমতাকে কেউ স্পর্শ করতে পারেনি। কংগ্রেস এর কিছু এলে-বেলে স্থানীয় নেতা মমতাকে ডুবিয়েছিল। ২০০৪ সালে নানান ফন্দি ফিকির করে তৃনমূল কংগ্রেস কে হারিয়েছিল, সিপিএম-কংগ্রেস এর যৌথ প্রয়াস। একই ধারা বিধান সভার ২০০৬ নির্বাচন। তবে ২০০৬ সালেই মমতার তৃণমূল রাজনীতির জলবিভাজিকা । সিঙ্গুরের এবং নন্দীগ্রামের কৃষক আন্দোলন, মমতার জীবন পণ করা অনশনই মানুষকে বুঝিয়ে ছিল তার সততার ও মানুষের জন্য তার মমত্বের গভীরতা। তাই ২০০৮ সালের পঞ্চায়েত নির্বাচনের পর তাকে আর পিছন ফিরে তাকাতে হয়নি। সাধারণ দরিদ্র খেটে খাওয়া মানুষই কিন্তু তাদের বিশ্বাস, ভালোবাসা আর শ্রদ্ধায় মমতাকে তাঁর বর্তমান উচ্চতায় পৌছে দিয়েছে।

[Read previous post on দৃষ্টিপাত >>]

< Back to List

 
Comments (0)
 
 
Post a Comment Comments Moderation Policy
 
Name:    Email:
 
Comment:
 
 
 
Security Code:
(Please enter the security code shown above)
 

Comments and Moderation Policy

MaaMatiManush.tv encourages open discussion and debate, but please adhere to the rules below, before posting. Comments or Replies that are found to be in violation of any one or more of the guidelines will be automatically deleted.

  • Personal attacks/name calling will not be tolerated. This applies to comments or replies directed at the author, other commenters or repliers and other politicians/public figures. Please do not post comments or replies that target a specific community, caste, nationality or religion.

  • While you do not have to use your real name, any commenters using any MaaMatiManush.tv writer's name will be deleted, and the commenter banned from participating in any future discussions.

  • Comments and replies will be moderated for abusive and offensive language.

×

© 2017 Maa Mati Manush About Us  |  Contact   |   Disclaimer   |   Privacy Policy   |   Site Map