M3 Views

মহাকরণ ভবনের সংস্কার এবং সচিবালয়ের বিকেন্দ্রীকরণ এক বলিষ্ঠ পদক্ষেপ

অমিয় চৌধুরী  | September 5, 2013

রাইটার্স বিল্ডিং অর্থাৎ মহাকরণ ভবনের বয়স এখন ২৩৬ বছর। ১৭৭৭ সালে, ব্রিটেন থেকে আগত কেরানিকূলের থাকা-খাওয়া এবং কাজ করবার জন্য এই বাড়িটি তৈরি করা হয়েছিল। পরবর্তীকালে সমান্তরালভাবে বাড়িটা সম্প্রসারণ করা হয়।

মহাকরণের বাইরের যে মুখ তা অসাধারণ কারিগরি দক্ষতার নিদর্শন। স্থানাভাবে পরে রাইটার্স-এর অভ্যন্তরে আরো নতুন নতুন বাড়ি তৈরি হয়। ওগুলো ভেঙে ফেলা যেতে পারে। তাতে মহাকরণ ভবনে মর্যাদা তো ক্ষুণ্ণ হবেই না, বরং ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ হিসেবেই গন্য হবে। মহাকরণের অন্দরে যারা গেছেন – যেমন লাইব্রেরি, ক্যান্টিন ইত্যাদি জায়গায়, তারা অবশ্যই লক্ষ করে থাকবেন আসল মহাকরণ বাড়িটা একটা জতুগৃহে পরিণত হয়েছে। এলোমেলো ভাবে অসংখ্য বিদ্যুৎবাহী তার ঝুলছে। শীততাপ-নিয়ন্ত্রিত যন্ত্রগুলো থেকে জল পড়ে দেওয়াল ভিজিয়ে রাখছে অবিরত, দূর্বল ছাদের ফাটল দিয়ে পৌঁছে যাচ্ছে মন্ত্রীদের ঘরে পর্যন্ত। ধুলোস্তর জমেছে অসংখ্য ফাইল-ভর্তি কেরানীদের ঘরে। সেখানেও বিভিন্ন করিডোরে খাবার বিক্রি হচ্ছে, চা প্রস্তুত হচ্ছে। এই রকম অবস্থা চললে হয়ত স্বল্পকালের মধ্যেই ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ বিল্ডিং হিসেবে এই বাড়ির গঙ্গাপ্রাপ্তি ঘটবে। অতএব মহাকরণের সংস্কার অতিব গুরুত্বপূর্ণ। এই কাজে মনে হয় অর্থেরও খুব একটা অভাব হবেনা।

হেরিটেজ রক্ষায় দায়িত্বপ্রাপ্ত বিভিন্ন দপ্তরের মাধ্যমে কেন্দ্রীয় সরকারও অর্থ সাহায্যে অঙ্গিকারবদ্ধ। হেরিটেজ রক্ষায় ইউনেস্কো অর্থ বণ্টন করে থাকে। অর্থাৎ, এই কাজটি অনেক আগেই করা উচিত ছিল। সেটা করার বদলে বিভিন্ন জায়গায় সচিবলয় গড়ে তোলা হয়। যেমন গঙ্গার ধারে বহুতল বিশিষ্ট ‘নিউ সেক্রেটারিয়েট’ বিল্ডিং, সল্টলেকের বিভিন্ন ভবন, ক্যামাক স্ট্রিটের বহুতল বাড়ি যেখানে শিল্প দপ্তরের বেশ কয়েকটি শাখা রয়েছে, ফ্রি স্কুল স্ট্রিট এর খাদ্য দপ্তর ইত্যাদি। এই বাড়িগুলোতে অনায়াসেই বিভিন্ন মন্ত্রিদের স্থান করে দেওয়া যায়। কিন্তু অসুবিধা একটাই। মহাকরণ ভবনে মুখ্যমন্ত্রী, মুখ্যসচিব, স্বরাষ্ট্র সচিব, বড় পুলিশ কর্তাদের বসবার স্থান। অর্থাৎ এক কথায় রাজ্যের ক্ষমতার ভরকেন্দ্র মহাকরণ ভবন। সব মন্ত্রীই মহাকরণে বসতে চান। বামফ্রন্ট-এর আমল থেকেই বিভিন্ন জায়গায় মন্ত্রীদের ঘর করে দিলেও মন্ত্রীরা অনেকেই মহাকরণ ভবনে একটি ঘর অধিকার করে থাকতে চান। তাদের এই ইচ্ছেটা হয়তো অস্বাভাবিকও নয়। আরও কিছু অসুবিধা দেখা দিতে পারে। প্রতিদিন মহাকরণে বহু মানুষের যাতায়াত। তারা পরিবহন সমস্যার সম্মুখিন হতে পারেন। অসংখ্য কর্মচারী যারা দীর্ঘদিন মহাকরণে বসছেন তাদের দিক থেকে একটা নতুন কিছু গ্রহণ করার অনিহাও কাজ করতে পারে। এই সব বাঁধা বিঘ্ন অগ্রাহ্য করবার গুরুদায়িত্ব প্রশাসনের।

এই সব বাঁধা বিঘ্ন এবং অসুবিধার কথা মাথায় রেখেই মূখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় মহাকরণ অর্থাৎ প্রশাসনিক ব্যবস্থাকে বিকেন্দ্রীকরণ করতে চেয়েছেন। এই সিদ্ধান্ত গ্রহণ বড় সোজা নয়। তবে অবশ্যই কালোপযোগী এবং কাম্য পদক্ষেপ। সৎ এবং সুশাসনের প্রবল ইচ্ছার সামনে কোনো বাঁধাই শেষ পর্যন্ত টিকতে পারেনা। মহাকরণ স্থানান্তকরণের বিরুদ্ধে নানা যুক্তি সাজানো হয়েছে। মানসিকভাবে না হয় সিদ্ধান্তটি মেনেই নেওয়া গেল। কিন্তু মহাকরণের হাজার হাজার ফাইল স্থানান্তকরণ প্রক্রিয়ায় যদি অতি গুরুত্বপূর্ণ কিছু ফাইল হারিয়ে যায়, বা নষ্ট হয়, তবে সেগুলো প্রতিস্থাপন কি ভাবে করা হবে? এখানে বলে রাখা ভাল যে, মহাকরণ থেকে কোনও সব বিভাগগুলো এখনই স্থানান্তরিত হবে না, এবং সার্ভিস রেকর্ড এর মত গুরুত্বপূর্ণ নথি সরানোও হবে না।

কাউকে ভাববার সুযোগ না দিয়েই হঠাৎ-ই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এই সিদ্ধান্ত নিয়ে নেন। একদিন হাওড়া পরিদর্শনে গিয়ে হাওড়ার ডুমুরজলা অঞ্চলের স্টেডিয়াম-এর পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে ৫০ একর জমির সন্ধান পান। আর ফেরার পথে হুগলী নদীর পশ্চিমপাড়ে একটা বহুতল বিশিষ্ট বাড়ি দেখে উনি মনস্থির করেন মহাকরণ ভবনের ১২/১৩টি দপ্তর এখানে নিয়ে আসা যেতে পারে। এই বহুতল বাড়িটির নির্মাণ সদ্য শেষ হয়েছে। দ্বিতীয় হুগলী সেতু থেকে জি টি রোডে নেমে দক্ষিণ দিকে কিছুটা এগোলেই এক বাড়ি। পশ্চিমবঙ্গ সরকার এবং এক জার্মান সংস্থার যৌথ উদ্যোগে এই সুন্দর বাড়িটি নির্মিত। মেটিয়াব্রুজ এবং মহেশতলা অঞ্চলের হাজার হাজার পোশাক তৈরির কারিগর এবং দর্জিদের পুনর্বাসনের জন্য বিগত বামফ্রন্ট সরকার একটা ‘গারমেন্ট পার্ক’ তৈরি করতে চেয়েছিল। শহর অঞ্চলে জমির বড় অভাব। অথচ ওই দর্জিসম্প্রদায়ের মানুষকে কোন রকমে উঠিয়ে দিতে পারলে জমির ব্যবস্থা হয়। অভাবনীয়ভাবে প্রোমোটিং ব্যবসায় অসংখ্য বহুতল বানিয়ে প্রভূত অর্থ উপার্জনের রাস্তা তৈরি হয়। কিন্তু সেই ব্যবস্থা কার্যকরী করার অনেক আগেই বামফ্রন্ট সরকার ক্ষমতাচ্যূত হয়ে যায়। এখন ওই ফাঁকা প্রশস্থ বাড়িটির প্রতি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় আকৃষ্ট হন। মহাকরণ এই বাড়িতে সরিয়ে আনলে রাইটার্স-এর সংস্কার প্রক্রিয়া শুরু করা সহজ সাধ্য হয়। আর প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার বিকেন্দ্রীকরণ সহজ হয়। মূখ্যমন্ত্রী যদি এই কাজটি সুসম্পন্ন করতে পারেন তবে হাওড়ার অধিবাসীদের দীর্ঘদিনের আশাও পূরণ করতে পারবেন।

হাওড়া শহরের পতন হয়েছিল কলকাতার অনেক আগে। কলকাতার বয়স যদি ৩০০ বছর ধরা হয় তবে হাওড়ার ৫০০ বছর। একদা হাওড়া ছিল ম্যানুফ্যাকচারিং শিল্পকেন্দ্র এবং হুগলী নদীর পশ্চিমপাড় জুড়ে ছিল জুটমিল এবং অন্যান্য কারখানার মেলা। সত্তর দশকের শেষ থেকেই যা বন্ধ হয়ে গেছে। একসময় কলকাতার উন্নয়নের পশ্চাৎ ভূমি ছিল হাওড়া। হাওড়া স্টেশন কলকাতার সঙ্গে সমগ্র ভারতের যোগাযোগের সব থেকে বড় কেন্দ্র, অথচ অবহেলিত। তখন কলকাতার শিয়ালদহ-এর সঙ্গে কোন তুলনাই হতো না। অথচ কয়েকটি প্রান্তিক অঞ্চলে বড় বাসা তৈরি ছাড়া হাওড়ায় আর কিছুই হয়নি। সেই ৪০/৫০ দশকের হাওড়া আছে তার গলি ঘুঁজি তস্য গলির অন্দরেই অতএব মমতার উদ্দেশ্য রূপায়িত হলে হাওড়া এক নতুন এবং আধুনিক অস্তিত্বে ভূষিত হবে। হাওড়া আর কলকাতা থেকে বেশী দূরে থাকবেনা। কলকাতার মানুষের হাওড়ার দিকে নিচু হয়ে চাওয়ার দিন শেষ হবে। হাওড়াবাসী একাগ্র চিত্তে মূখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়-এর উদ্যোগকে তাই সাধুবাদ জানাচ্ছে।

[Read previous post on দৃষ্টিপাত >>]

< Back to List

 
Comments (0)
 
 
Post a Comment Comments Moderation Policy
 
Name:    Email:
 
Comment:
 
 
 
Security Code:
(Please enter the security code shown above)
 

Comments and Moderation Policy

MaaMatiManush.tv encourages open discussion and debate, but please adhere to the rules below, before posting. Comments or Replies that are found to be in violation of any one or more of the guidelines will be automatically deleted.

  • Personal attacks/name calling will not be tolerated. This applies to comments or replies directed at the author, other commenters or repliers and other politicians/public figures. Please do not post comments or replies that target a specific community, caste, nationality or religion.

  • While you do not have to use your real name, any commenters using any MaaMatiManush.tv writer's name will be deleted, and the commenter banned from participating in any future discussions.

  • Comments and replies will be moderated for abusive and offensive language.

×

© 2017 Maa Mati Manush About Us  |  Contact   |   Disclaimer   |   Privacy Policy   |   Site Map