M3 Views

ডুবন্ত কংগ্রেস এবং ফেডারেল ফ্রন্ট

অমিয় চৌধুরী  | September 13, 2013

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কি শেষ পর্যন্ত কংগ্রেস এর সঙ্গে জোটবদ্ধ হয়ে ২০১৪র নির্বাচন এ রাজি হবেন! তৃনমূলের অন্যান্য সদস্য এবং শুভানুধ্যায়ীরা বলবেন পশ্চিমবঙ্গে জোট না হলেও তৃণমূলকে, কংগ্রেস বা সিপিএম কেউই ঠেকাতে পারবেনা। অর্থাৎ যে কোনও অবস্থাতেই ‘অ্যাডভ্যান্টেজ তৃণমূল কংগ্রেস’। কংগ্রেস এর সঙ্গ ছেড়েছিলেন মমতা, কতগুলো বৃহত্তর জনস্বার্থ বিরোধী, মনমোহন সিংহের তথা কংগ্রেসী নীতি এবং কার্য্যকারণ পদ্ধতির প্রতিবাদে। কংগ্রেস কিন্তু তারা সেই নীতিগুলোর একটিও পরিমার্জন বা পরিত্যাগ করেনি। দিনের পর দিন, খেটে খাওয়া মানুষ এবং মধ্যবিত্ত সম্প্রদায়কে আকাশছোঁয়া মূল্যবৃদ্ধি প্রায় খাদের কিনারায় এনে ফেলেছে। ক্রমাগত ডলার, পাউন্ড আর ইউরোর তুলনায় টাকার অকল্পনিয় অবমূল্যায়ন ঘটে চলেছে। ১৯৯০ দশকের প্রথমভাগে দক্ষিনপূর্ব এশিয়ার দেশগুলি, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়ায় যা ঘটেছিল ভারতের এখন সেই অবস্থা।

পেট্রোলিয়ামজাত দ্রব্য ইত্যাদির দাম কিছুতেই কেন্দ্রীয় সরকার কব্জা করতে পারছেনা। খুচরো পণ্যে সরাসরি বিদেশী বিনিয়োগের প্রায় অবাধ প্রবেশেরই প্রতিবাদে এবং অন্যান্য অনেকগুলো কেন্দ্রীয় জোট সরকারের একক ভাবে কংগ্রেস-এর সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় জোট ছেড়ে বেরিয়ে আসেন। বিদেশী বিনিয়োগ আসেনি। দেশের সামগ্রিক উৎপাদন কমেছে। রপ্তানির পরিমান কমেছে আর অন্যদিকে দিনের পর দিন রাজকোষ ঘাটতির পরিমান বেড়েছে। কেন্দ্রীয় সরকার চোখ মেলে সবই দেখছে অথচ তার করার কিছু নেই। সাধারণ মানুষের ভাগ্য ঝুলে আছে সরকারি নীতির অপপ্রয়োগের জন্য। একটা সার্বিক নীতি যা দেশের মানুষকে রুজি, রোজগার এবং কল্যাণের জন্য একটা সুনিয়ন্ত্রিত সামাজিক সুরক্ষা বলয়ের মধ্যে নিয়ে আসতে পারে, তার কোনও গ্রাহ্যমান সরকারি পদক্ষেপের চিহ্নমাত্র নেই। সরকারের চিন্তা ভাবনাই এডহকিজম্‌ এর দ্বারা আক্রান্ত। অন্যদিকে কেন্দ্রীয় কংগ্রেস সরকার এবং এই সরকারের মন্ত্রীরা, এমনকি প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরও আকণ্ঠ দুর্নীতিতে জরিয়ে পড়েছে। তৃণমূল কংগ্রেস এবং পরে দক্ষিণের ডিএমকে সরকার থেকে বেরিয়ে আসায় কেন্দ্রীয় সরকার তাই সংখ্যালঘু হয়ে গেছে। এই সংখ্যালঘু সরকার লোকসভা ভেঙে না দিয়ে আরো কিছু সুখ সুবিধার জন্য বিদেশী কিছু শক্তি এবং প্রতিষ্ঠান-এর কাছে দেশটাকে প্রায় বন্ধক রেখে দিচ্ছে। কেন্দ্রীয় সরকারের কিছু প্রতিষ্ঠানিক ক্ষমতা প্রয়োগের ভয় দেখিয়ে দুর্নীতিগ্রস্ত মুলায়মের সমাজবাদী পার্টি এবং মায়াবতীর বহুজন সমাজ পার্টি বাইরে থেকে নেওয়া সমর্থনে কোনও রকমে মনমোহন সিংহ সংখ্যালঘু সরকারকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত চালিয়ে নিতে প্রায় দৃঢ় প্রতিজ্ঞ। এই সরকার সর্বক্ষেত্রে বৈধতা হারিয়েছে।

সমস্যার পাহাড় জমছে। অথচ ক্ষমতা ছাড়তে মন চাইছে না। তৃণমূল কংগ্রেস এবং কোনও কোনও ক্ষেত্রে বিজেপিও এই মুহূর্তে সরকারের পদত্যাগ চাইছে। অবশ্য বিজেপির আবার অন্য লক্ষ্যও আছে। গোলমাল হই হট্টগোলের মধ্যেই মনমোহন সিংহ কয়েকটি জনবিরোধী, প্রায় অসংশোধিত, খাদ্য সুরক্ষা বিল, জমি বিল, পেনশন বিল, বিমা বিল পাশ করিয়ে নিয়েছে। দুর্নীতির প্রশ্নে প্রধানমন্ত্রীকে বিবৃতি দানে বাধ্য করে বিমা বিল, পেনশন বিল গুলি প্রায় অলক্ষ্যে গিলে ফেলেছে বিজেপি। এই সব জনবিরোধী আইন কানুনের বিরুদ্ধে এক মাত্র তৃণমূল কংগ্রেসই আপোষহীন ভাবে সংসদীয় লড়াই চালিয়ে গেছে। অহংকারী কংগ্রেস দল বাইরে যতই লম্ফঝম্প করুক বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গ, হরিয়ানা ইত্যাদি রাজ্যে ওরা বুঝে গেছে ২০০৯ সালের ২০৬ জন সদস্য লোক সভায় আর আসছেন না। বিভিন্ন জনমত সমীক্ষাতেও দেখা গেছে কংগ্রেস এবং তার জোট সঙ্গিদের ১২৮ এর বেশি আসন পাওয়ার কথা নয়। বিজেপির অবস্থা একটু ভালো হলেও সরকার গড়ার অবস্থায় উঠে আসবেনা। কংগ্রেস এই ক’বছরে অসংখ্য দুর্নীতির জালে জড়িয়ে গেছে। কয়লা বণ্টন ব্যবস্থায় দুর্নীতিতে জড়িয়েছে স্বয়ং প্রধানমন্ত্রীর অফিস। সিবিআই কে স্বাধীন ভাবে কাজ করতে না দেওয়ায় সুপ্রিম কোর্ট রীতিমত ক্ষুব্ধ। আইনমন্ত্রী অশ্বিনী কুমারকে পদত্যাগ করতে হয়েছে। রেলগেট কেলেঙ্কারিতে পদত্যাগ করেছেন পবন বনশাল। অতএব কংগ্রেস এর নেতৃবর্গ বুঝে গেছে ২০১৪ সংসদীয় নির্বাচনে কংগ্রেস একক ভাবে হালে পানি পাবেনা।

রাহুল গান্ধীকে প্রধানমন্ত্রী করবার বাসনা কংগ্রেস সভা নেত্রীর - রাহুল গান্ধী কিন্তু ১৯৮৪ সালের মাতৃহত্যার শোকে আক্রান্ত রাজীব গান্ধী নন। এই প্রেক্ষিতে প্রধানমন্ত্রী রাজনৈতিক জল্পনা উস্কে দেওয়ার ছলেই জি-২০র অধিবেশন শেষ করে উড়োজাহাজ-এর মধ্যেই সাংবাদিক সম্মেলন করে হঠাৎই বলে দিলেন- রাহুলের নেতৃত্বে কাজ করতে পারলে তিনি খুশিই। সঙ্গে সঙ্গেই বলেছেন তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কে ২০১৪র নির্বাচনে জোট সঙ্গী পেলে তিনি বন্ধুত্বের হাত বাড়িয়ে দেবেন। রাহুল সংক্রান্ত মনমোহন-এর বার্তার অন্তরালে তার মন নয়, রয়েছে কংগ্রেস রাজনীতির আঙিনা একটু জল ঘোলা করে দেওয়ার অভিসন্ধি। এটা সম্ভবত অভিমানী প্রধানমন্ত্রীর সংসদের মধ্যে অপমান, এবং তার স্বপক্ষে কংগ্রেসীদের আক্রমণাত্মক রনকৌশলের অনুপস্থিতির বহিপ্রকাশ; না হলে বিরোধীদের অপমানের উত্তরে মনমোহন-এর মত শান্ত লোক বলে ওঠেন – পৃথিবীর কোনও গনতান্ত্রিক দেশে প্রধান মন্ত্রীকে সংসদে দাড়িয়ে চোর অপবাদে ভূষিত হতে হয় না। সেই মুহূর্তে প্রধানমন্ত্রী বোধ হয় রাজীব গান্ধীর বিরুদ্ধে, বিজেপি, জনতা দলের বিশ্বনাথ প্রতাপ এবং সিপিএম-এর সেই উল্লসিত স্লোগান- ‘গলি গলি মেয় শোর হ্যায় প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধী চোর হ্যায়’ এর কথা স্মরণ করেছিলেন। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়-এর রাজনৈতিক সৌজন্য বোধ মনমোহনের অজানা নয়। রাহুল গান্ধীর চেয়ে অনেক বেশি জনগ্রাহ্যতা এবং ক্যারিশ্মা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়-এর। তাই ডুবন্ত কংগ্রেসকে আবার বাঁচিয়ে তুলতে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং তার তৃণমূলের সাহায্য দরকার। কেননা পশ্চিমবঙ্গে টিভিতে বক্তৃতারত অশালীন কংগ্রেস নেতৃত্ব এখন ডুবন্ত। সিপিএম নামক দুর্যোধন উরুভঙ্গ। পশ্চিমবঙ্গে তাই তৃণমূল কংগ্রেস-এর কংগ্রেসের সঙ্গে জোট করার প্রয়োজন আছে বলে মনে হয়না।

ভারতবর্ষের সার্বিক রাজনীতিতে মমতা একটি সম্ভ্রম জাগানো নাম। কংগ্রেস এবং বিজেপি এখন ক্ষীয়মাণ রাজনৈতিক ভাবে। সিপিএম সহ মুলায়ম, মায়াবতীরা তৃতীয় ফ্রন্ট এবং পরবর্তীতে চন্দ্রবাবু নাইডুরা ইউপিএ-২ সরকারের পতন-এর পর চতুর্থ ফ্রন্ট-এর কথা বলেছেন। সেই ক্ষেত্রে কংগ্রেস, বিজেপিকে বাদ দিয়ে সমস্ত আঞ্চলিক দল এবং রাজ্যকেন্দ্রিক দলগুলোকে একধরণের পারস্পরিক স্বার্থ রক্ষায় একটি ফেডারেল ফ্রন্ট বা যুক্ত মোর্চার রাজনৈতিক উত্থানকে ত্বরান্বিত করবার প্রয়াসী হয়েছেন মমতা। এই পলিটিক্যাল ফরমেশন বা রাজনৈতিক কাঠামো পরিচালনা করার মতো ক্ষমতা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের আছে। কেননা সম্পূর্ণ ব্যক্তি স্বার্থে তিনি কখনই ক্ষমতায় টিকে থাকতে আসেননি। গত ২০ বছরের ইতিহাসই এই দিক থেকে মমতার পক্ষে রয়ে গেছে।

কংগ্রেস এখন এক ‘টাইটানিক’ (যেহেতু বয়সটা ১২৭ বছর)। এখন কংগ্রেস তো মমতার হাত ধরতে চাইবেই। তৃণমূল কংগ্রেস যেহেতু অন্যান্য রাজ্যেও তার অস্তিত্বপ্রমাণ করছে, তখন মমতার প্রয়োজন কোথায় আবার কংগ্রেস এর হাত ধরার। বিগত বেশ কিছুদিন ধরেই যে সব সমীক্ষা বেরোচ্ছে তাতে বারবারই বলা হয়েছে ২০১৪র নির্বাচনে আঞ্চলিক এবং রাজ্য দলগুলোর আসন সংখ্যা অনেক বেড়ে যাবে। এই সব দলগুলি একত্রিত হয়ে যে ফ্রন্ট গঠিত হবে, তাকেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ফেডারেল ফ্রন্ট নাম করণ করে দিয়েছেন। এইসব ভাবনা চিন্তা থেকে চরম দুর্নীতিগ্রস্ত কংগ্রেস নেতৃত্ব বড়ই অস্বস্তি ভোগ করছেন। রাহুল গান্ধীকে সামনে এনে নির্বাচনে গেলে, কংগ্রেস যে খুব একটা ভালো ফল করবে, তা ভাববার কোনও কারণ নেই। সেই সম্ভাবনার কথা মাথায় রেখেই সম্ভবত অপমানিত অভিমানী ভাবি প্রধানমন্ত্রী মনমোহন রাহুলের নেতৃত্বের প্রশ্ন তুলে দিলেন আর একই সঙ্গে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়-এর হাত ধরতে চাইছেন। এক ঢিলে দুই পাখি মারা আর কি!

পশ্চিমবঙ্গে পঞ্চায়েত ভোটে প্রায় একছত্র ক্ষমতা পেয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কেন পশ্চিমবঙ্গের সিপিএম-এর স্বাভাবিক বন্ধু কংগ্রেস-এর হাত ধরতে যাবেন। এই ক্ষেত্রে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তার পরিকল্পিত ফেডারেল ফ্রন্ট গড়ে জাতীয় রাজনীতিতে অতি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকায় অংশগ্রহণ করবেন আশা করা যায়। বর্তমানের চালচিত্রে এটাই বোধ হয় তৃণমূল কংগ্রেস-এর পক্ষে স্বাভাবিক পদক্ষেপ।

[Read previous post on দৃষ্টিপাত >>]

< Back to List

 
Comments (0)
 
 
Post a Comment Comments Moderation Policy
 
Name:    Email:
 
Comment:
 
 
 
Security Code:
(Please enter the security code shown above)
 

Comments and Moderation Policy

MaaMatiManush.tv encourages open discussion and debate, but please adhere to the rules below, before posting. Comments or Replies that are found to be in violation of any one or more of the guidelines will be automatically deleted.

  • Personal attacks/name calling will not be tolerated. This applies to comments or replies directed at the author, other commenters or repliers and other politicians/public figures. Please do not post comments or replies that target a specific community, caste, nationality or religion.

  • While you do not have to use your real name, any commenters using any MaaMatiManush.tv writer's name will be deleted, and the commenter banned from participating in any future discussions.

  • Comments and replies will be moderated for abusive and offensive language.

×

© 2017 Maa Mati Manush About Us  |  Contact   |   Disclaimer   |   Privacy Policy   |   Site Map