M3 Views

দলীয় রাজনীতির কবলে ছাত্র রাজনীতিঃ ফলশ্রুতি ছাত্র-শিক্ষক সম্পর্কের অবনতি

অমিয় চৌধুরী  | September 25, 2013

ছাত্র শিক্ষক সম্পর্ক কি হবে – এই নিয়ে আমরা মাথার চুল ছিঁড়ছি এখন। এখন যে সম্পর্ক দাঁড়িয়েছে, বিগত ১৯৬০ এর দশকে তা ছিল না। ছাত্রদের পরবর্তী জীবনের একটা ছন্দ তৈরি হয়ে যায় তাদের স্কুল জীবনেই। এই প্রসঙ্গে ব্যক্তিগত একটা ঘটনা মনে পরে যায়। স্কুলজীবনটা কেটেছিল হাওড়ার বিবেকানন্দ ইনস্টিটিউশনে । মাস্টারমশাইরা সবাই খুবই সাধারণ ঘরের মানুষ ছিলেন। অত্যন্ত স্নেহ প্রবণ, ভালো খারাপ সব ছাত্রের প্রতি। ছোট ছোট ছাত্ররা কিন্তু এক একটা খুদে শয়তান। প্রত্যেকে মাষ্টার মশাইয়ের কথা বলার ভঙ্গি, হাঁটা চলা এবং তাদের পড়াবার কতকগুলো মুদ্রাদোষ লক্ষ্য করে, এক এক জনের নাম দিয়ে দেওয়া হত। তার মানে এই নয় যে সেই নামকরণের মাধ্যমে মাষ্টারমশাইদের ছাত্ররা হেয় বা অপমানিত করত। এগুলো ছিল তাদের, মাষ্টারমশাইদের আড়ালে মজা করবার ধরন। স্কুলের মাষ্টারমশাইরাও তা জানতেন। তারা কখনও এই নিয়ে কোনও ছাত্রের প্রতি বিতরাগ হতেন না। বরং সস্নেহ দৃষ্টিতে এই সবকিছুকে অবহেলাই করতেন। কখনই রেগে গিয়ে কোনদিন শাস্তি দিতেন না। আর শাস্তি দিলেও তা হতো - বাইরে নিল ডাউন করে রাখা বা বেঞ্চের ওপর দাঁড় করিয়ে দেওয়া। ছোটদেরও আত্মমর্যাদা বোধ থাকে। কিন্তু এই সব শাস্তি পেয়ে তারা ক্লাসের মধ্যে লজ্জা পেত। কিন্তু কখনই মাষ্টারমশাইয়ের প্রতি রাগ পুষে রাখতো না। সেই সময় স্কুল থেকে পাশ করে বেরিয়ে কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়েও কিন্ত সেই মজার খেলাচ্ছলে মাষ্টারমশাইদের নামকরণ করে দিত তারা। কলেজ এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপকরা অলক্ষ্যে একথা সেকথা শুনে বরং মজাই পেতেন। ক্লাসরুমে প্রায় যুবক হয়ে ওঠা ছেলে মেয়েদের এইজন্য কখনঅ অবজ্ঞা বা কটুক্তি করতেন না। পরীক্ষার খাতায় নম্বরও কমিয়ে দিতেন না। এখনও এইসব ব্যাপারগুলো চলে।

যে কথা দিয়ে শুরু করেছিলাম। আমরা তখন ক্লাস এইটে পড়ি। আমাদের তখন হেডপণ্ডিত মশাইয়ের ক্লাস করা শুরু হয়নি। সংস্কৃত পড়াতেন যুধিষ্ঠিরবাবু স্যার। লম্বা সিরিঙে মানুষ। পাঞ্জাবি পড়লে মনে হতো জামাটা হ্যাঙ্গারে ঝোলানো হয়েছে। মেদিনিপুরের মানুষ। কথায় একটা টান ছিল। ক্লাসে এসে ঝালিয়ে নেওয়ার নাম করে প্রত্যেক ছাত্রকে প্রশ্ন করতেন। পড়া না পারলে একটু ক্ষিপ্ত হতেন। সেদিন কি হয়েছিল জানিনা। পর পর দুদিন পড়া তৈরি করে না আসায় খুবই ভদ্র, ভাল মানুষ মৃনালকে দুটো প্রশ্ন করলেন। ও উত্তর দিতে পারল না। সঙ্গে সঙ্গে চেয়ার ছেড়ে গিয়ে ওর চুলের ঝুটি ধরে ওপরে তুলে ফেললেন। হাতে কয়েকগাছি চুল উঠে এল। বোধ হয় একটু রক্তও বেরিয়েছিল। মৃনাল কোন রকম শব্দ না করে ওর দিকে করুণ মুখে তাকালো। তার পর সে এক অবাক দৃশ্য। যুধিষ্ঠিরবাবু মৃনালকে জড়িয়ে ধরে প্রায় কান্নার সুরে বললেন, “এ আমি কি করলাম! আমার শাস্তি পাওয়া উচিৎ।“ ওই ভাবেই ওকে ধরে হেডুর(হেডমাস্টার) ঘরে নিয়ে গেলেন। কলেজের দারোয়ান গজেনদা ওর মাথায় ওষুধ লাগালো। আর উনি বার বার বলতে লাগলেন স্যার আমাকে শাস্তি দিন। মৃনাল বার বার বলছিল, “না স্যার আমার লাগেনি।“ যুধিষ্ঠিরবাবুর তখন বিলাপ যেন কত বড় পাপ করেছেন। হেডমাস্টারমশাই শুধু ওকে বললেন – “আপনি স্টাফ রুমে যান।“ এই মাস্টারমশাইয়ের ছাত্রের প্রতি ভালোবাসা আর শাস্তির পরিমাণ বেশি হলে অনুতাপে জর্জর হওয়ার দৃশ্যতো মানুষের সারা জীবনের অভিজ্ঞতা। এ জিনিষ আজ উধাও। কলেজের, এমনকি বিশ্ববিদ্যালয়ের, কিছু অধ্যাপক আজকাল যান্ত্রিক। টাকা কামানোর যন্ত্র। কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ের চাকরিটা তো পরে পাওয়া। কখনও ক্লাস করে করে কখনো না করে ছুটছেন তাদের এক একটি টিউশনের ঠেকে। সেন্ট জেভিয়ার্স, রামকৃষ্ণ মিশনের কথা বাদ দিলে অধিকাংশ কলেজের অধ্যাপক সপ্তাহের দুটো দিন ক্লাসে না এসে বাড়িতে দুটো তিনটে ব্যাচে তার নিজের কলেজের ছাত্র পড়িয়ে রাশি রাশি রোজগার করেন। দামি জামাকাপড় পড়েন। আর একটা করে গাড়ি কিনে ফেলেন। সুতরাং এই যদি অবস্থা হয় তবে ছাত্ররা কেন সম্মানের চোখে দেখবে শিক্ষককে। উপরন্তু যতক্ষণ প্রফেসার্স রুমে থাকবেন কোন একটা রাজনীতির দলে থেকে, তারা রাজা উজির মারবেন আর সেই সব ছাত্রদেরই খুশি রাখবেন যারা তার দলীয় মতাদর্শের এবং কার্যাবলীর সাথে জড়িত। শিক্ষক-ছাত্রের সম্পর্ক এখন অনেকটাই বিষিয়ে গেছে। সবকিছু নির্ধারিত হচ্ছে শিক্ষক ছাত্রের রাজনীতির স্বার্থে। বড় রাজনীতির পরিসর ছাত্রজীবনের অমূল্য সময়গুলো গিলে ফেলছে। এ থেকে মুক্তির আশা দুরাশা মাত্র। ছাত্র রাজনীতি এখন কোনও না কোনও দলীয় বৃহত্তর রাজনীতির পরিসরে। আর বড় রাজনীতির অর্থাৎ দলীয় নেতাদের কব্জায় ছাত্র রাজনীতি এসে গেছে। সব কিছুই ক্ষমতাসীনদের রাজনীতি–বিরোধী রাজনীতি। ছাত্র সমাজের মানসিকতা, দৃষ্টিভঙ্গি অমূল পালটে দিয়েছে। পঞ্চাশ, ষাটের দশকেও যে ছাত্ররাজনীতি ছিল না তা নয়, তবে তা মানুষের মূল্যবোধগুলো বিকৃত করে দেয়নি। তখন বড়জোর ছাত্র সংসদের নির্বাচনে বিশেষ করে তথাকথিত প্রগতিবাদী রাজনীতির দাদারা ছাত্র সংসদের ঘরে বসে তাদের মতাবলম্বী ছাত্ররা কি ভাবে নির্বাচন পরিচালনা করবে, কোন্‌ ধরণের ভোট করে জিততে হবে তা শিখিয়ে দিতেন। তাদের বিপক্ষের ছাত্রদেরও যথেষ্ট প্রভাব ছিল। ছাত্র রাজনীতি তখনও একটা বিশেষ স্ট্যালিনিস্ট রাজনীতির পুরো কব্জায় আসেনি। প্রসঙ্গত, একটা ঘটনা অবতারণা করলে বামফ্রন্ট তথা সিপিএম এর সর্বগ্রাসী রাজনীতি এবং তাদের ছাত্র সংগঠনের শাখা এস্‌ এফ আই এর বিগত ১৯৭৭ থেকে ১৯১১ সালের অধিকারবাদী ছাত্র রাজনীতি এবং শিক্ষক ছাত্রের বর্তমান অবক্ষয়ের পরিচয় পাওয়া কঠিন হবে না। এক অতিথি অধ্যাপক ডিপার্টমেন্টের দুটি ক্লাস নিয়ে হেড-এর ঘরে বসে চা খাচ্ছিলেন। তিনটি ছেলে মেয়ে এসে হেড এর কাছে অন্য তিনটি ছেলের বাড়ির ঠিকানা চাইল। অধ্যাপকের উপস্থিতিতে হেড একটু বিব্রত বোধ করলেন,- অধ্যাপকমশাই প্রশ্ন করেন – ওদের ঠিকানা নিয়ে কি করবে তোমরা? আসলে সামনেই ছাত্র পরিষদের নির্বাচন। এস এফ আই ৬০টি আসনেই প্রার্থী দিয়েছে। হঠাৎ উটকো ৩টি ছেলে মেয়ে মনোনয়ন জমা দিয়েছে। অতএব ওদের বাড়ি গিয়ে মনোনয়ন পত্রগুলো তুলিয়ে নিতে হবে। অধ্যাপকমশাই বললেন – কেন এসব করছ? ওরা তিনজন জিতুক বা হারুক, তোমাদের নির্বাচনের গনতান্ত্রিক বৈধতা তো বরং বাড়বে। এ ঘটনা বেশি দিনের নয়। ছেলেরা কথা শোনেনি। অতএব নিরব প্রতিবাদে ওখানকার চাকরিটি ছেড়ে দেন সেই অধ্যাপক মশাই। এই হচ্ছে গত তিন দশকেরও বেশি সময় এস এফ আই এর কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র রাজনীতির কায়দা। অর্থাৎ বিরোধিদের সম্পূর্ণভাবে বোতল বন্দি করে রাখা। এখানে দলীয় শিক্ষক ছাড়া অন্যদের সঙ্গে ছাত্রদের সত্যিকারের কোন শ্রদ্ধা আর প্রীতির সম্পর্ক থাকা সম্ভব?

এখন মাঝে মাঝেই শোনা যায় তৃণমূল ছাত্র পরিষদ নাকি কিছু কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদের দখলের রাজনীতি করে গোলমাল পাকাচ্ছে। কোন মুখে সিপিএম এর সমর্থকরা এবং সাথী কংগ্রেস কে নিয়ে বিশেষ সন্ধ্যাকালীন বাসরে নিত্যদিন তৃণমূলের শ্রাদ্ধ করছেন? কংগ্রেসই বা কোন মুখে তাদের ৬০ বা ৭০এর দশকের হিংস্র ছাত্র রাজনীতির কথা ভুলে গিয়ে ভালো মানুষ সাজেন? আর সিপিএমতো বিরোধী ছাত্র পরিষদকে এতাবৎকাল বোতল বন্দী করে রেখেছিলেন। এখন বোতলের ছিপি খুলে গেছে। অতএব অনাকাঙ্ক্ষিত হলেও প্রাথমিক প্রতিক্রিয়া তো এমনি হওয়ার কথা। ফলে ঘটেছে ছাত্র শিক্ষক সম্পর্কের ক্রমাবনতি।

< Back to List

 
Comments (1)
 
JAYANTA CHOUDHURI Reply
September 27, 2013
ri8, student-teacher relation shuld be-'SRODHA BAN LOVOTE GYANAM..' GITA
 
Post a Comment Comments Moderation Policy
 
Name:    Email:
 
Comment:
 
 
 
Security Code:
(Please enter the security code shown above)
 

Comments and Moderation Policy

MaaMatiManush.tv encourages open discussion and debate, but please adhere to the rules below, before posting. Comments or Replies that are found to be in violation of any one or more of the guidelines will be automatically deleted.

  • Personal attacks/name calling will not be tolerated. This applies to comments or replies directed at the author, other commenters or repliers and other politicians/public figures. Please do not post comments or replies that target a specific community, caste, nationality or religion.

  • While you do not have to use your real name, any commenters using any MaaMatiManush.tv writer's name will be deleted, and the commenter banned from participating in any future discussions.

  • Comments and replies will be moderated for abusive and offensive language.

×

© 2017 Maa Mati Manush About Us  |  Contact   |   Disclaimer   |   Privacy Policy   |   Site Map