M3 Views

রাহুল গান্ধীর বিস্ফোরক মন্তব্য – কংগ্রেস সভানেত্রী সোনিয়া গান্ধির রাজনীতিরই বহিঃপ্রকাশ

অমিয় চৌধুরী  | September 30, 2013

গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী প্রধানমন্ত্রীর দৌড়ে রাহুল গান্ধীকে টেক্কা দিয়ে অনেকটাই এগিয়ে গিয়েছেন। কিন্তু প্রশ্ন হল, নরেন্দ্র দামোদর দাস মোদী কি শুধুমাত্র তার ‘উন্নয়ন’ এর স্বপ্ন, বক্তৃতায় জোশ এবং কারুকার্য দিয়ে দ্বিধা দ্বন্দ্বে দীর্ঘ এবং নেতৃত্বের লড়াইয়ে প্রায় ছন্নছাড়া ভারতীয় জনতা পার্টিকে, ভারতের প্রথম দল হিসেবে তুলে আনতে পারবেন! যদিও আগামী ২০১৪ সালের সংসদীয় নির্বাচনের সময় এখনো প্রায় আট মাস। এই সময়ের আগেই প্রাক-নির্বাচনী সমীক্ষায়, অবশ্যই কিছু জাতীয় টেলিভিশনে, প্রধানমন্ত্রী হিসেবে এগিয়ে আছেন মোদী এবং তুলনামূলক ভাবে কংগ্রেসের আসন সংখ্যাও দেখানো হচ্ছে বিজেপির চেয়ে পিছিয়ে আছে। গণতান্ত্রিক পরিসরে রাজনীতির চাপানউতরে আটমাস কেন একমাসও এক দীর্ঘ সময়। একমাত্র দলীয় ভোটার ছাড়া যে বিপুল সংখ্যক নির্দল ভোটার এবং যারাই সবচেয়ে বেশি নির্বাচনের ফলাফল নির্ধারণ করেন, তারা নির্বাচনের আগে সবসময় দোদুল্যমান। তাদের অনেকেই ভোট বাক্সের সামনে দাড়িয়েও মনস্থির করতে পারেন। তাদের ‘সুয়িং ফ্যাক্টরই’ দলের ভাগ্য নিয়ন্ত্রণ করে থাকে। সুতরাং দলকে তুলে ধরার দায়িত্ব দলের সর্বোচ্চ নেতার ওপরই বর্তায়।

এই প্রেক্ষিতেই রাহুল গান্ধীর সাম্প্রতিক ক্রিয়া-প্রক্রিয়া এবং বিতর্কিত অধ্যাদেশ-সম্পর্কিত বিলম্বিত বিরোধিতার আসল উদ্দেশ্যকে বুঝে নিতে হবে। বিয়াল্লিশ বছরের রাহুল হঠাৎ একমুহূর্তে রাগি যুবকে রূপান্তরিত হয়ে হাজির হয়ে গেলেন অজয় মাকানের সাংবাদিক সম্মেলনের প্রায় মধ্য পর্বে। অজয় মাকেন কংগ্রেস দলের মিডিয়া ফেস বা ম্যানেজার। সেদিন, অর্থাৎ গত ২৭ সেপ্টেম্বর, সংবাদ প্রতিনিধিদের সামনে বসিয়ে দাগি অপরাধীদের উদ্দেশ্যে, তাদের নির্বাচনে অংশগ্রহণে বাঁধা সৃষ্টি করে জুলাই মাসে সুপ্রিম কোর্ট যে রায় ঘোষনা করেছিল তার অযৌক্তিকতা ব্যাখ্যা করছিলেন এবং মন্ত্রীপরিষদ ২৪শে সেপ্টেম্বর যে অর্ডিন্যান্স বা অধ্যাদেশ সর্বসম্মতিক্রমে প্রস্তুত করে রাষ্ট্রপতির অনুমোদনের জন্য পাঠিয়েছিল, বর্তমান সময়ে তার প্রয়োজনীয়তা ব্যাখ্যা করছিলেন। মাঝপথে হঠাৎ থেমে গিয়ে একটা ফোন ধরতে গেলেন। সাংবাদিকরা তখন উসখুস করছেন। অজয় মাকেন ফিরে এসে বললেন – আপনাদের জন্য সুখবর। কংগ্রেস সহসভাপতি এই কিছুক্ষণের মধ্যেই এসে পড়বেন। তখন পর্যন্ত কিন্তু মাকেন সাহেব মন্ত্রীপরিষদে পাশ হওয়া অধ্যাদেশ-এর ওপরই তার পূর্ববর্তী সমর্থনের রেশই টেনে যাচ্ছিলেন। নাটকীয় ভঙ্গিতে রাহুল গান্ধী এলেন। অজয় মাকেন সাহেব তার সামনে মাইক্রোফোন এবং অসংখ্য টেলিভিশন-বুম এগিয়ে দিলেন। প্রায় কোন রকম ভূমিকা না করেই রাহুল রিহার্সেল করা রাগে বললেন রাষ্ট্রপতির কাছে পাঠানো অর্ডিন্যান্সটি ‘ননসেন্স’ বা কাণ্ডজ্ঞান বর্হিত। এটাকে ছিঁড়ে টুকরো করে ছুঁড়ে ফেলা উচিৎ ছিল। কথাগুলো দুবার উচ্চারণ করলেন। কিছু অন্য কথার মত এমনটাও বললেন – এটা তার ব্যক্তিগত মত অবশ্য। কংগ্রেস-এর দ্বিতীয় নেতা নিশ্চয়ই ভুলে ছিলেন না – যে কংগ্রেস এর ডাকা সাংবাদিক সম্মেলনে কংগ্রেস-এর সহসভাপতি কোন ব্যক্তিগত মত এত তীব্রভাবে প্রকাশ করতে পারেন না। এটা নিশ্চয়ই একটা তাৎক্ষনিক প্রতিক্রিয়া ছিল না। একে নাটক বললেও অবশ্যই বলতে হয় এই তাৎক্ষনিক নাটকটি ছিল ‘ওয়েল রিহার্সড’। অর্থাৎ অনেক ভাবনা চিন্তা করে কি বলতে হবে, বাস্তব অভিনয়টা কেমন করতে হবে, জেনে বুঝেই সাংবাদিক নাট্যমঞ্চে চট্‌জলদি রাহুল এসেছিলেন।

এমন মনে হতেই পারে – এর পেছনে কংগ্রেস সভানেত্রী সোনিয়া গান্ধীর কোন মদত ছিল না। কেননা ২১ সেপ্টেম্বর সোনিয়া গান্ধীর নেতৃত্বেই কংগ্রেস কোর কমিটি অর্ডিন্যান্স বা অধ্যাদেশটির খসড়া তৈরি করে। পরে ২৪ সেপ্টেম্বর মন্ত্রীপরিষদ সর্বসম্মতিক্রমে অনুমোদন করে রাষ্ট্রপতির কাছে পাঠায়। মন্ত্রীপরিষদে এটা অনুমোদন করার পেছনে কংগ্রেস দলেরও প্রভূত স্বার্থ জড়িত।

রাজ্যবিধানসভার কথা ছেড়ে দেওয়াই গেলো। বর্তমান সংসদের প্রায় এক তৃতীয়াংশ অর্থাৎ ১৬২ জন দুর্নীতিগ্রস্থ বিভিন্ন অপরাধে যুক্ত সাংসদ রয়েছেন। রসিদ মাসুদের মত কংগ্রেস নেতা যেমন আছেন তেমনি আর জে ডি-র লালুপ্রসাদ যাদবও রয়েছেন। জোট রাজনীতির সঠিক ব্যবস্থাপনার জন্য সরকারের সমর্থনকারী দলের সদস্যদের প্রতিও বড় শরিক কংগ্রেসের দায় থেকেই যায়। যদি অর্ডিন্যান্সটি চটজলদি পাশ করিয়ে নেওয়া না যায় তবে ৩০শে সেপ্টেম্বর আদালতের আদেশে লালু প্রসাদ যাদব ফেঁসে যেতে পারেন। অথচ লালুপ্রসাদের মত এক রাজনীতির ম্যানেজারকে বাঁচানোর প্রয়োজন আছে। সিবিআই কোর্টে লালুপ্রসাদ অবশ্য বাঁচতে পারেননি। একদা ঘোর কংগ্রেসী, এখন রাষ্ট্রপতি, প্রণব মুখার্জি দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে ৩০শে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত অর্ডিন্যান্সটিতে সই করেননি। রাষ্ট্রপতি সই নাও করতে পারেন – তার রাজনৈতিক কারণটি যে সোনিয়া গান্ধী বোঝেননি তা নয়। এতো এক অতিসক্রিয় রাষ্ট্রপতি। তিনি অতীতে কংগ্রেসের জন্য জীবনপাত করেও অনেক সময়ই অবহেলিত থেকে গিয়েছিলেন। এদিকে বিজেপির প্রধানমন্ত্রী পদের প্রার্থী নরেন্দ্র মোদী তার রাজনৈতিক আক্রমণে অতি আগ্রাসী। দিনে দিনে তার এক নতুন ভাবমূর্তি তৈরি হচ্ছে। অপর দিকে অঘোষিত কংগ্রেস-এর যুবক রাহুল, প্রধানমন্ত্রী পদপ্রার্থী। কিন্তু মোদীর তুলনায় রাজনীতি ভাবনায় নিতান্তই শিশু। অতএব নাটকীয় ভাবে রাহুল গান্ধীর অতি সৎ এবং স্বচ্ছ ভাবমূর্তি ‘জনগনেশ’-এর সামনে তুলে ধরা এখন জরুরি। এইসবই কংগ্রেস সভানেত্রীর রাজনৈতিক কৌশল। সোনিয়া গান্ধীর নিশ্চয়ই স্মরণে আছে – ২০০৩ সালে গুজরাট বিধান সভা নির্বাচনের বেশ কিছুদিন আগে মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জে এম লিংডো, প্রার্থীদের কয়েকটি বিষয়ে ‘এফিডেভিট’ করতে আদেশ দিয়েছিলেন। যে নির্বাচন প্রার্থীর ব্যক্তিগত এবং পারিবারিক স্থাবর অস্থাবর সম্পদের পরিমাণ। প্রার্থীর বিরুদ্ধে কোন আইনগত অপরাধের ছাপ আছে কিনা, জেল খেটেছেন কিনা ইত্যাদি। সমস্ত রাজনৈতিক দলই, এর বিরোধিতায় কোমর বেঁধে নামেন। কিন্তু শেষপর্যন্ত সুপ্রিম কোর্টের রায়ে রাজনৈতিক দলগুলোকে পিছু হাঁটতে হয়। এখন এইসব বিষয়গুলো প্রার্থীদের নির্বাচন কমিশনকে জানানো বাধ্যতামূলক। যদিও অতীত অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে অনেক প্রার্থীই সত্য কথা লেখেননা। অতএব ২৪শে সেপ্টেম্বরের রচিত অধ্যাদেশ-এর ভাগ্যও যে সুপ্রিম কোর্ট বাতিল করবে না – এমনটা নাও হতে পারে। অতএব সম্মানজনক পশ্চাদোপসরণের একটা রাস্তা দেখতেই এবং রাহুলের রাজনৈতিক ভাবমূর্তি তৈরি করতে অত্যন্ত ভাবনা চিন্তা করেই, ওই রকম নাটকীয় ভাবে রাহুলকে সংবাদ মাধ্যমের সামনে দাঁড়িয়ে ওই কথাগুলো বলার পেছনে অবশ্যই বর্তমানে অসুস্থ সোনিয়ার মদত ছিল। কেননা এই অধ্যাদেশের বিরুদ্ধে তরুন সাংসদ মিলিন্দ দেওড়া দাঁড়িয়েছিলেন। দিগ্বিজয় সিংহ মৃদু আপত্তি জানিয়েছিলেন। এবার সবার পাল থেকে হাওয়া কেড়ে নিতে রাহুল গান্ধীর অগ্রাগমন সম্পূর্ণভাবেই সোনিয়া গান্ধীর দাবার ছকের মতই ছিল।

কিন্তু সভাস্থলে রাহুল গান্ধী তার ভাষা ব্যবহারে যে এমন অপরিণত রাজনীতিকের পরিচয় দেবেন সোনিয়া হয়তো সেটার অঙ্কটা আগে থেকে কল্পনা করতে পারেননি। বিশেষত সোনিয়া গান্ধী, রাহুলের ভাষার ব্যবহার এবং এমন আক্রমনাত্মক ভঙ্গি হয়ত ঠিক বুঝে ওঠেননি। বিশেষ করে জোট সরকারে একমাত্র এবং প্রথম নেতা প্রধানমন্ত্রী যখন যুক্তরাষ্ট্রে তার বক্তৃতায় শান দিচ্ছেন এবং সমগ্র ভারতের নেতা হিসেবে রাষ্ট্রসংঘে দেশের একাত্ববোধ এবং সমগ্র ভারতের অস্মিতার ছবিটা তুলে ধরতে গেছেন। বক্তৃতা করবেন জেনারেল এসেম্বলিতে, পাকিস্তান এবং ইন্দো-আমেরিকার দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক বিষয়ে। রাহুলের মন্তব্য যখন বিরোধীরা বিশেষ করে বিজেপি এবং এই বিষয়ে যুক্ত হয়ে গেছে বামপন্থীরা এবং অবশ্যই তৃণমূল কংগ্রেস। তখন প্রধানমন্ত্রীর অবস্থিতির বৈধতার প্রশ্নও উঠে যেতে পারে। নরেনরদ্  মোদী আরও আক্রমনাত্মক। অতএব ড্যামেজ কন্ট্রোলে সোনিয়া ফোন করেন মনমোহন সিংহকে। রাহুল গান্ধীও সুর নরম করে ই-মেল করেন প্রধানমন্ত্রীকে। তবে সোনিয়া গান্ধী মনে মনে এটাও জানেন যে মনমোহন সিংহ দেশে ফিরেও হঠকরি কোন সিদ্ধান্ত- যা বিরোধী দলগুলি চাইছে- নেবেন না। রাগে দুঃখে পদত্যাগ করে কংগ্রেস-এর জোট সরকারকে এখুনি নির্বাচনের মুখে ঠেলে দেবেন না। কেননা তিনি তো নিজেই সাংবাদিকদের বলেছেন- রাহুল গান্ধীর সঙ্গে এবং তার কতৃত্বে কাজ করতে ভবিষ্যতে তার কোন অসুবিধা হবেনা। অতএব সোনিয়া, রাহুলের পরোক্ষ এবং অপরোক্ষ বর্তমান রাজনীতি পরবর্তী সময়ে রাহুলের পথই পরিষ্কার করে দেবে। তবে একথাও মনে রাখতে হবে যে আগামী নির্বাচনে কংগ্রেস তো বটেই বিজেপির খুব একটা সুবিধে হবেনা। বরং আঞ্চলিক এবং রাজ্য দলগুলির মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের থিসিস্‌এর মত একটা 'ফেডারেল কাঠামোয়' থেকে বড় দুটি জাতীয় দলকে কঠোর অনুশাসনের মধ্যে নিয়ে আসা হবে।

< Back to List

 
Comments (0)
 
 
Post a Comment Comments Moderation Policy
 
Name:    Email:
 
Comment:
 
 
 
Security Code:
(Please enter the security code shown above)
 

Comments and Moderation Policy

MaaMatiManush.tv encourages open discussion and debate, but please adhere to the rules below, before posting. Comments or Replies that are found to be in violation of any one or more of the guidelines will be automatically deleted.

  • Personal attacks/name calling will not be tolerated. This applies to comments or replies directed at the author, other commenters or repliers and other politicians/public figures. Please do not post comments or replies that target a specific community, caste, nationality or religion.

  • While you do not have to use your real name, any commenters using any MaaMatiManush.tv writer's name will be deleted, and the commenter banned from participating in any future discussions.

  • Comments and replies will be moderated for abusive and offensive language.

×

© 2017 Maa Mati Manush About Us  |  Contact   |   Disclaimer   |   Privacy Policy   |   Site Map