M3 Views

রঘুরাম রাজন কমিটির সুপারিশ সম্পূর্ণভাবে কার্যকরী হলে পশ্চিমবঙ্গ অবশ্যই অবিচারের শিকার

অমিয় চৌধুরী  | October 9, 2013

রঘুরাম রাজন কমিটির দায়িত্ব ছিল জাতীয় সম্পদের অংশ কিভাবে এবং কতটুকু পরিমানে রাজ্য সরকারগুলির মধ্যে বন্টন করা হবে এবং কোন ফর্মুলায়। কেন্দ্রীয় সরকার বাজেট পাশ করবার পর বাজেটের খুঁটিনাটি এবং পদ্ধতিগত ব্যাপারগুলো স্থির করবার জন্য মাঝে মাঝে এ ধরণের কমিটি তৈরি হয়ে থাকে। এই কমিটিগুলির দায়িত্ব থাকে রাজ্যগুলির এবং কেন্দ্রীয় সরকারের জাতীয় বিত্ত সম্পদগুলি কি পদ্ধতি এবং সূচক-এর মাধ্যমে ভাগাভাগি করে দেওয়া যায়। ২০১৩ সালের বাজেট পেশ করবার পর এমন একটা কমিটির হাতে দায়িত্ব দেওয়া হয়। এই কমিটির কাজ ছিল কতকগুলি সূচক নির্ণয় করে দেওয়া যার মাধ্যমে ভারতে ২৮ অঙ্গরাজ্যের বর্তমান অর্থনীতির সমস্যা এবং অবস্থিতি জেনে নেওয়া। রঘুরাম রাজন প্রধানমন্ত্রীর অর্থনৈতিক উপদেষ্টার পৌরাহিত্যে এই কমিটি গঠন করা হয়। অপর ৫ জন সদস্য হলেন – অর্থনীতিবিদ শৈবাল গুপ্ত, ভরত রামাস্বামী, নাজিব জং, নিরজা গোপাল জয়াল এবং তুহিন পাণ্ডে। তবে অল্পদিনের মধ্যেই নাজিব জং দিল্লীর লেফটেন্যান্ট গভর্নর হয়ে যান। অতএব সভাপতি রঘুরাম রাজন সহ কমিটির রিপোর্ট তৈরি করে অপর চারজন। রিপোর্টটি সরকারের ঘরে পেশ করা হয় সেপ্টেম্বর ১, ২০১৩। রিপোর্টটি তৈরির প্রথম পর্বেই সদস্যদের মধ্যে মতদ্বৈধতা প্রকাশ্যে চলে আসে। কমিটির শুরু হয় বিহারকে বিশেষ একটা শ্রেণীভুক্ত করার চাহিদাকে কেন্দ্র করে। পশ্চিমবঙ্গও দাবি করেছিল এই বিশেষ শ্রেণীভুক্ত হতে। কেননা ৩৪ বছরের একটা একঘেয়েমির অচলায়ন সরকারকে সরিয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় একটা রাজ্যের ভার নিলেন। একদা পশ্চিমবঙ্গ উন্নত ছিল। এর কাজের নিরিখও ভাল ছিল। কিন্তু ৩৪ বছর পর বামফ্রন্ট সরকার যখন ক্ষমতা চ্যূত হল, তারা তাদের উত্তরসুরির জন্যে রেখে গেল দু লক্ষ ছ’হাজার কোটির ঋণ-ভার। কর্ম সংস্কৃতি তখন খাঁদের কিনারায়। বামপন্থী দলগুলো অনেককিছু গুছিয়ে নিয়েছে। অগুন্তি গ্রামের মানুষ এদের ভয়ে কুঁকড়ে থেকেছে দিনের পর দিন। একেবারেই রাজ্যে যে উন্নয়ন হয়নি তা নয়। তবে সরকারের উন্নয়ন কর্মকান্ড তার কার্যকারিতা অসম্ভব ঘাটতির মুখে। নতুন সরকার এসে নতুন উদ্যমে (উন্নয়ন সম্প্রসারে) নেমে পরে। বিভিন্ন ক্ষেত্রে উন্নয়নের মান তুলে আনে। কিন্তু প্রয়োজন প্রচুর অর্থের, রাজকোষে যা শূন্যেরও বহু নিচে। আর রাজস্ব আদায়ে বিপুল ঘাটতি। মাঝে মাঝেই বন্যা আর কোথাও বা খরার কবলে রাজ্যের আর্থিক অবস্থান ক্রমশ নিম্নমুখি। ঋণের দায় থেকে কিছুটা মুক্তি পাওয়ার একটা উপায় হিসাবে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকার ১২ হাজার কোটি টাকার একটা বিশেষ অনুদান এবং প্রতি বছর ২১ থেকে ২৫ কোটি টাকার সুদের কবল থেকে একটু স্বস্তি পাওয়ার জন্য আপাতত তিন বছরের জন্য ঋণ ফেরতের ওপর স্থগিত আদেশ চেয়েছিল। কিন্তু কেন্দ্রীয় সরকারের শরিকত্ব ত্যাগ করায় সেটা আর হয়ে ওঠেনি। হয়ত বিহারের ক্ষেত্রে নীতিশ কুমার বিশেষ অনুদান তার চাহিদা অনুযায়ী পেয়ে যাবেন। কেননা লোকে বলছে ২০১৪র নির্বাচনে কংগ্রেস নীতিশের সাহায্য আশা করে আছে। ২০০৮ সালের ভীষণ বন্যার মুকাবিলা করতে গিয়ে ১০ হাজার কোটি টাকা পেয়েছিল বিহার। তখন সবে মাত্র তিন বছরের মাথায় নীতিশ কুমার তার সহযোগী ভারতীয় জনতা পার্টিকে শরিক করে বিহারে ক্ষমতায় এসেছেন। বিহারের কর্মকান্ড এবং উন্নয়ন তখন থেকেই ঊর্ধ্বমুখী হতে শুরু করেছে। তবে বর্তমানে রঘুরাম রাজন কমিটি যা সুপারিশ করেছে তাতে করে বিহার কিছুটা হলেও উন্নয়নমুখি হতে পারবে। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের অবস্থা স্থিতবস্থা থেকে নিম্নমুখি হওয়ার সম্ভাবনা প্রবল। আসলে এই কমিটির প্রয়োজন সামান্যই।

কেন্দ্রীয় সরকার-এর সম্পদ তো রাজ্যগুলো দ্বারাই উৎপাদিত হয়। আর সেই সম্পদের অংশ কোন রাজ্য কি পরিমাণে পাবে, তার আয়তন আর জনসংখ্যার ভিত্তিতে কেন্দ্রীয় ফিনান্স কমিশনই ঠিক করে দেয়। তার উপর আছে পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনায় নির্মিত রাজ্যের অর্থপ্রাপ্তি। উপরন্তু রঘুরাম রাজন কমিটির সুপারিশ তো অবশ্যই থাকতে পারে। তবে তা উন্নয়নের মাত্রা এবং রাজ্যে রাজ্যে সরকারের কার্যক্রমের মান-এর ওপর নির্ভরশীল হওয়া চাই। এ ক্ষেত্রে কমিটির যদি কোন রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক পূর্ব পরিকল্পিত ধারণা থাকে তবে তা বাস্তব সংগত হবে না। রঘুরাম রাজন কমিটিতে তা যে হয়নি তা নয়। দশটি উপাদানকে তারা প্রাধান্য দিয়ে একটা দশ পয়েন্ট স্কেল করেছেন। কমিটির বিচার্য বিষয়গুলি হল রাজ্যগুলিকে তার বর্তমান মান, আর্থসামাজিক অবস্থায় বিচার করতে হবে যেমন – ১. প্রত্যেক পরিবারের মাথাপিছু ভোগ্যপণ্যের ব্যবহারের পরিমাণ,

২. শিক্ষার হার

৩. স্বাস্থ্যব্যবস্থা,

৪. পারিবারিক সুযোগ সুবিধার ব্যবস্থা,

৫. দারিদ্রের হার,

৬. মহিলাদের স্বাক্ষরতার হার,

৭. রাজ্যে রাজ্যে তপশিলী জাতি, উপজাতির হার,

৮. নগরায়ন এবং তার গতি,

৯. পরিবার প্রতি আর্থিক লেনদেন এবং ব্যাঙ্ক ব্যবস্থা ব্যবহারের পরিমাণ এবং

১০. যোগাযোগ এবং চলাচলের সুবিধা।

এই উল্লেখিত ৭ নম্বর এবং ৯ নম্বর নিয়েই কমিটিতে মতদ্বৈধতার শুরু। ফলে কমিটি রিপোর্টটিতে সবাই একমত হন না। খুব যথার্থ ভাবেই শৈবাল গুপ্ত তার বিরুদ্ধ মত লিপিবদ্ধ করেন। স্কেলের পয়েন্ট ওয়ান থেকে যত ওপরে যাওয়া যাবে সেই রাজ্যগুলো ততো অনুন্নত বলে গন্য হবে। এটাই হল কমিটির মতে বহুমাত্রিক সার্বিক উন্নয়ন-এর সূচক(Multi dimensional index)। সবচেয়ে কম উন্নত দশটি রাজ্য হল – ওড়িশা, বিহার, মধ্যপ্রদেশ, ছত্তিশগড়, ঝাড়খণ্ড, অরুণাচল প্রদেশ, আসাম, মেঘালয়, উত্তরপ্রদেশ এবং রাজস্থান। ৭টি অপেক্ষাকৃত কম উন্নত রাজ্য যেমন মণিপুর, পশ্চিমবঙ্গ, নাগাল্যান্ড, অন্ধ্রপ্রদেশ, জম্মু ও কাশ্মীর, মিজোরাম, গুজরাট, ত্রিপুরা, কর্ণাটক, সিকিম এবং হিমাচল প্রদেশ। আর এই কমিটির স্কেল বিচারে যারা একদমই নিচের দিকে তারাই সবচেয়ে উন্নত যার সংখ্যা সাত। যেমন গোয়া, কেরালা, তামিল নাডু, পঞ্জাব, মহারাষ্ট্র, উত্তরাখণ্ড এবং হরিয়ানা। এই স্কেলের পয়েন্ট অনুসারে উন্নত অনুন্নত স্থির করার মধ্যেই গোলযোগটা রয়ে গেছে। প্রথমত, ভোগ্যপন্য ব্যবহারই একটি পরিবারের এগিয়ে থাকার মান হতে পারেনা। অতি দরিদ্র যারা তাদের আয়ের সবটাই ভোগ্য পন্যর জন্য ব্যয় করতে হয়। তাদের কোন সঞ্চয় থাকেনা। আর সঞ্চয় না থাকলে বিনিয়োগ হবে কি করে। অর্থাৎ এই রাজ্যগুলোয় শিল্পের কোন পরিবেশ থাকেনা। পরিকাঠামো গড়া তোলার নানা সমস্যা থেকে গেছে।

সমস্ত অর্থাৎ ২৮ রাজ্যকে তিনটি শ্রেণীবদ্ধ করা হয়েছে। উন্নত, কম উন্নত এবং অতিশয় কম উন্নত। কোন রাজ্যের যে বিশেষ কিছু প্রয়োজন অথবা অভাব রয়েছে – যা স্থানগত, বিষয়াগত পরিস্থিতি ও পরিবেশ সংক্রান্ত – তার কোন বাস্তব ভিত্তিকে এই কমিটি স্বীকৃতি দেয়নি। একটা চতুর্থ শ্রেনী বা বিশেষ শ্রেনীগত রাষ্ট্র যেমন পশ্চিমবঙ্গ, মণিপুর এমনকি বিহার, ওড়িশা এবং আসামও বটে। সমস্ত কেন্দ্রীয় সম্পদ বাটোয়ারা হবে একই হারে অর্থাৎ ০.৩ শতাংশ উন্নত, কম উন্নত এবং অতিকম উন্নত রাজ্যগুলিতে। সূচকের ০.৬ এর ওপরে যারা তারা বেশি কিছু উপরন্তু সাহায্য পেতে পারে। কিন্তু কোন ক্ষেত্রেই অনুন্নত বিশেষ শ্রেণীর রাজ্যকে এই কমিটির সুপারিশের আওতায় আনা হল না। এখন পশ্চিমবঙ্গ বিশেষ শ্রেণীগত সুবিধার জন্য অর্থ তো পাবেই না, উপরন্তু সবার সঙ্গে একই ভাবে ওই ০.৩ শতাংশ অর্থ পেলে, অবশ্যই তা হবে পশ্চিমবঙ্গের পক্ষে, কেন্দ্রীয় সরকার-এর চরম অবহেলার এবং প্রতিহিংসার নিদর্শন। স্বাভাবিকভাবেই বেশ কিছু প্রশ্ন ওঠে। রঘুরাম রাজন কমিটির সুপারিশ কার্যকরী করা কেন্দ্রীয় সংখ্যালঘু সরকার পশ্চিমবঙ্গ সহ আরও কয়েকটি অসুবিধা জনক রাজ্যের প্রতি রাজনৈতিক বৈষম্যমূলক আচরণ করা ছাড়া আর কিছুই নয়।

< Back to List

 
Comments (0)
 
 
Post a Comment Comments Moderation Policy
 
Name:    Email:
 
Comment:
 
 
 
Security Code:
(Please enter the security code shown above)
 

Comments and Moderation Policy

MaaMatiManush.tv encourages open discussion and debate, but please adhere to the rules below, before posting. Comments or Replies that are found to be in violation of any one or more of the guidelines will be automatically deleted.

  • Personal attacks/name calling will not be tolerated. This applies to comments or replies directed at the author, other commenters or repliers and other politicians/public figures. Please do not post comments or replies that target a specific community, caste, nationality or religion.

  • While you do not have to use your real name, any commenters using any MaaMatiManush.tv writer's name will be deleted, and the commenter banned from participating in any future discussions.

  • Comments and replies will be moderated for abusive and offensive language.

×

© 2017 Maa Mati Manush About Us  |  Contact   |   Disclaimer   |   Privacy Policy   |   Site Map