M3 Views

ওড়িশা উপকূলে ‘ফাইলিন’ আর পশ্চিমবঙ্গে ‘ডেরি-ফাইলিনের’ তাণ্ডব

অমিয় চৌধুরী  | October 23, 2013

দুর্গাপুজোয় মহাষষ্ঠীর দিন একটা পুজোর উদ্বোধন অনুষ্ঠানে যেতে হয়েছিল। সৌগত রায় উদ্বোধন করলেন। এটিও একটি থিম পুজো। পাড়ার খুব সাধারণ নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারের ছেলে ছোকরা সব। ওরা খুব যত্ন করে মহেঞ্জোদারোর ধ্বংসস্তূপে পাওয়া মূর্তি এবং প্রাপ্ত আরও আনুসঙ্গিক দিয়ে ওই সময়টা ধরতে চেষ্টা করেছে ওদের সাধ্যমতো। খুঁটিনাটি সবকিছুই অনেক পরিশ্রমের ফল। তাই অনেক আশা। তবে ওদের মনে ভয়, যে কোন মুহূর্তে ঝড়-বৃষ্টি ওদের এই আয়োজন নষ্ট করে দিতে পারে। দিনটা ছিল ভয়ানক গরম। আকাশ সেইবেলা দশটাতেই যেন জ্বলে যাচ্ছে। ওদের অভয় দিলাম, দুর্গাপুজোর চারদিনই আবহাওয়া আজকের মতই থাকবে। ওদের ভয় আবহাওয়া অফিস থেকে বলা হয়েছে অল্প থেকে ভারি বৃষ্টির সম্ভাবনা আছে। আরে, সরকারি আবহাওয়া দপ্তর এমন বলেই থাকে। ওরা যেদিন ভারি বৃষ্টি হবে বলে - সেদিন মানুষ ছাতা হাতে করে বেরোয় না। আর যেদিন বলে আকাশ খটখটে শুকনো থাকবে, সেদিন সব লোকের হাতে ছাতা দেখা যাবে। এটা তো একটা চালু রসিকতা।

এবার ১১ অক্টোবর মহাসপ্তমির দিন নীল রহস্যময় আকাশ। সকাল থেকে ভোর রাত পর্যন্ত প্যান্ডেলে প্যান্ডেলে মানুষের ঢল। কোথায় বৃষ্টি, কোথায় ঝড়! কিন্তু সত্যিই সমগ্র পশ্চিমবঙ্গেই মানুষ ঘুম থেকে উঠে দেখল আকাশের মুখ ভার। সেদিন মহাষ্টমী। লক্ষ লক্ষ মানুষের মন ভারাক্রান্ত করে বৃষ্টি নামল। প্যান্ডেল আর রাস্তায় সেই ভিড় কোথায়! পরের দিন নবমীতেও এক অবস্থা। কিন্তু আকাশের অবস্থা যেমনই থাকুক, আবহাওয়া অফিসের সাবধান বানী অনুযায়ী ওড়িশার উপকূল এবং উপকূল সন্নিহিত জেলা এবং অন্ধ্রপ্রদেশের বিশাখাপত্তনম, শ্রীকাকুলম এবং আরো দুএকটি স্থানের যা অবস্থা, সেরকম বিপদজনক সেই অবস্থা হয়নি পশ্চিমবঙ্গের জেলাগুলোতে। পশ্চিমবঙ্গে যা হয়েছে তা অবশ্যই কয়েকদিন পরে এবং যথেষ্ট ভয়ঙ্কর আকারে।

সেপ্টেম্বর এর শেষ দিক থেকেই অবিরাম বৃষ্টি হচ্ছিল। তখনি কলকাতার মৌসুমভবন থেকে বলা হচ্ছিল এবার পুজোয় অবিরাম বৃষ্টির সম্ভাবনা। মাঝখানের কয়েকদিন আকাশ ছিল নীল। এখানে ওখানে ভাসন্ত সাদা মেঘ। শরৎকালের হলুদ রোদ্দুর। মানুষের মনে উদ্দিপনা। কিন্তু ভেতরে ভেতরে একটা আশঙ্কাও কাজ করছিল। ওদিকে দিল্লীর মৌসুমভবন ক্রমাগত সতর্কতা জারি করছে। বঙ্গোপসাগরে প্রচণ্ড এক ঘূর্ণিঝড় ওড়িশা, অন্ধ্র এবং পশ্চিমবঙ্গের উপকূল এর দিকে ধেয়ে আসছে। এই প্রবলাকার ঝড়ের নাম 'ফাইলিন' দেওয়া হয়েছে। কথাটা থাই (থাইল্যান্ড) ভাষা থেকে নেওয়া। এর অর্থ "স্যাফায়ার"। অর্থাৎ নীলকান্ত মণি। ধূসর একটা গোল চোখ। চারপাশে লালের ছোঁয়া আর সেখান থেকে বিচ্ছুরিত নীলবর্ণের ছটা। ঘুরতে ঘুরতে সেই প্রচণ্ড তেজ প্রসারিত হচ্ছে।

এবার একদম ঠিকঠাক সময়টা বলে দিয়েছিল কেন্দ্রীয় মৌসমভবন। কদিন ধরেই সমুদ্র উপকূলবর্তী জেলে সম্প্রদায়কে মাছ ধরতে সমুদ্রে যাওয়া নিষেধ করা হচ্ছিল। ১৯৯৯ সালের অক্টোবর মাসেই সুপার সাইক্লোন আছড়ে পড়েছিল তৎকালীন ওড়িশা উপকূলে। আগাম যথেষ্ট সতর্কবার্তা ছিল না। আবহাওয়া বিজ্ঞানের কৃত কৌশল এবং বহু দূরবর্তী হাওয়া মাপবার যন্ত্রও ছিল সেকেলে। ওড়িশার উপকূল ছুয়ে বহুদূর ব্যপ্ত হল ঝড় আর বৃষ্টি। মানুষ মরলো ১০ থেকে ১৫ হাজার। কয়েক লক্ষ গবাদি পশু আর ২ লক্ষ থেকে তিন লাখ বাড়ি ঘরদোর ভেঙ্গে গুড়িয়ে গেল। এবার সাইক্লোন এর সতর্কবার্তায় এক কাঙ্ক্ষিত অবস্থা ফিরল অন্ধ্রপ্রদেশে। তেলেঙ্গানা প্রদেশের দাবিতে অধিকাংশ সরকারি কর্মী, বিভিন্ন পরিষেবার সঙ্গে যুক্ত মানুষজন এবং বিদ্যুৎকর্মী যারা লাগাতার হরতাল পালন করেছিলেন, তারা অন্তত সাময়িক কালের জন্য হরতাল তুলে নিলেন। অন্ধ্রের প্রশাসন যথেষ্ট প্রস্তুত হয়ে রইল। ফাইলিন কিন্তু প্রথম মাটি স্পর্শ করল ওড়িশা উপকূলের গুঞ্জাম জেলায়। সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হল গোপালপুর। এছাড়াও পুরী, কটক, বালেশ্বর ইত্যাদি জেলাগুলো। বাহাদুরি দিতে হয় ওড়িশার মুখ্যমন্ত্রী নবীন পট্টনায়ক এবং তার প্রশাসনকে। আগাম সতর্কবার্তা পাওয়া মাত্র উপকূলবর্তি অঞ্চলগুলো এক দের দিনের মধ্যেই প্রায় ৯ লক্ষ লোককে সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হল নিরাপদ আশ্রয়ে। এই সময় অদ্ভুতভাবে সমন্বয় রক্ষা করে কাজ করছিল ইন্ডিয়ান নেভি, সেনা বাহিনীর হেলিকপ্টার, বহু ক্ষেত্রে সেনাবাহিনীর একটা অংশ আর সর্বোপরি সমস্ত দিক দিয়ে নজরদারি করল ন্যাশনাল ডিসাস্টার ম্যানেজমেন্ট অথরিটি। মানুষ মরল প্রায় ২০/২১ জন। দুলক্ষের ওপর ঘর বাড়ি ভাঙল। মরল অসংখ্য গৃহপালিত এবং বন্য জীবজন্তু। তারপর 'ফাইলিন' সরে একটু ওপর দিকে উঠে ঢুকে পড়ল ঝাড়খণ্ড রাজ্যে।

ঝড়ের তাণ্ডব নয় মানুষ অতিষ্ট হল অবিরাম বৃষ্টিতে। নদীগুলো ফুলে ফেঁপে উঠল। ঝাড়খণ্ডের গালুডি ব্যারাজ জলে টইটুম্বুর। এদিকে দুর্গাপুর, তিলপারা এবং মাইথন, পাঞ্ছেত ব্যারাজগুলোতে ঝাড়খণ্ড থেকে বৃষ্টির জল এসে ভরে দিল। এমনিও এখানে থেমে থেমে বৃষ্টি হলেও প্রলম্বিত বর্ষায় বাঁধগুলির জল বিপদজনক সীমায় পৌছে যায়। অতএব বাঁধগুলি রক্ষা করার একমাত্র পথ ব্যারাজের দরজা খুলে দিয়ে ধারণ ক্ষমতার অতিরিক্ত জল বার করে দেওয়া। জলের বাঁধ খুলে দেওয়ায় অবিরত হু হু করে জল ঢুকে গেল পশ্চিমবঙ্গের নদী নালায়। ফাইলিন নামক সাইক্লোনের ঝাপ্টা সহ্য করতে হল না ঝাড়খণ্ডকে। পশ্চিমবঙ্গ ফাইলিনের শিকার হল। পশ্চিমবঙ্গের এই ভয়ানক অবস্থা দেখে অনেকেই মন্তব্য করেছিলেন পশ্চিমবঙ্গে ফাইলিন হয়নি। তবে ‘ডেরিভেটিব অব ফাইলিন’ অথবা ডেরি ফাইলিনের কবলে পড়েছে সমগ্র পশ্চিমাঞ্চল। নিজে বাঁচলে তবে বাপের নাম – এই প্রবচন মাথায় রেখে ঝাড়খণ্ড সরকার গালুডি ব্যারেজের জল ছেড়ে সুবর্ণরেখা – প্রায় মরা নদীকে ভাসিয়ে দিল। সেই জলের প্রবল প্রবাহ দুই মেদিনীপুরকে ভাসিয়ে দিল। ওদিকে সতর্কবার্তা না দিয়ে দুর্গাপুর ব্যারাজ কতৃপক্ষ মাইথন, পাঞ্ছেত আর দুর্গাপুর ড্যাম থেকে প্রতিদিন কয়েক লক্ষ কিউসেক জল ছাড়ল দামোদর, মুণ্ডেশ্বরী আর কিছু মজা নদীতে। দীর্ঘদিন নদী সংস্কার এর অভাবে পলি আর বালি জমে নদীবক্ষ ভরাট। অতএব বাড়তি জল প্লাবন আকারে ঢুকে পড়ল বর্ধমান, হুগলী, হাওড়ার বিভিন্ন এলাকায়। এদিকে মেদিনীপুরের গোপীবল্লভপুর, পাশকুরা, ঘাটাল – অর্থাৎ যে সব এলাকা বন্যা প্রবণ সেসব অঞ্চল কয়েক ফুট জলের তলায় ডুবে গেল।

উদ্ধার কাজের জন্য একমাত্র উপায় হল ছোট ছোট ডিঙ্গি আর নৌকা। উদ্ধার হওয়া এবং জলে আটকে থাকা পাকাবাড়ির লোকজনদের জল এবং খাদ্যের ব্যবস্থা করলেন মুখ্যমন্ত্রী নিজে দাড়িয়ে থেকে। মেদিনীপুর, জঙ্গলমহলের ঝাড়গ্রাম, গোপীবল্লভপুর লালগড়ের বন্যা কবলিত এলাকাগুলোকে পরিদর্শন এবং অন্যান্য ব্যবস্থা করতে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তার দলের কিছু কর্মকর্তা, গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রী এবং প্রশাসনিক কর্তাদের নিয়ে ছুটে গেলেন। দুদিন ওইসব জায়গায় দাড়িয়ে থেকে দুর্গত মানুষজনের মনে সাহস জোগালেন আর খাদ্যবস্ত্র এবং পানীয় জলের ব্যবস্থা করে তার সেই বিখ্যাত উক্তিটি আবার করলেন। ‘ম্যানমেড ফ্লাড’। সত্যিতো ব্যারাজ কর্তৃপক্ষ আগাম সতর্কবার্তা দিয়ে কিছু পরিমাণ যা বাইরের নদীগুলো কিছুটা হলেও ধারণ করতে পারে, রাজ্যসরকারের সঙ্গে আলোচনা করে করতে পারতেন। কেননা নদীর জল ধারণ করবার বহুগুণ ব্যারাজের জলই পশ্চিমবঙ্গকে আরও একবার বানভাসী করে ছাড়ল। ‘ফাইলিন’ বা নীলকান্ত মণির পরোক্ষ আলিঙ্গনে পশ্চিমবঙ্গের প্রাণ এখন ওষ্ঠাগত। ক্ষয় ক্ষতির পরিমাণ অকল্পনীয়। কেন্দ্রীয় সরকার ২০০৮ সালে বিহারের নদী বাঁধ ফাটলের বন্যায় আট হাজার কোটি টাকা দিয়ে সাহায্য করেছিল; এবারেও ক্ষয় ক্ষতির কিছুটা পুরণের জন্য পশ্চিমবঙ্গের মত ঋণগ্রস্ত একটা রাজ্য এবং তার প্রচণ্ড ব্যাক্তিত্ব সম্পন্ন, স্বাধীনচেতা মুখ্যমন্ত্রীর জন্য কোন রকম সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেওয়া তাদের উচিত। রাজনৈতিক সাহায্যের প্রতিশ্রুতি না পেলে দুর্নীতিতে জরাগ্রস্থ কেন্দ্রীয় কংগ্রেস হয়ত নিরুত্তাপই থাকবে। এটাই সাম্প্রতিক অতীতের অভিজ্ঞতা।

< Back to List

 
Comments (0)
 
 
Post a Comment Comments Moderation Policy
 
Name:    Email:
 
Comment:
 
 
 
Security Code:
(Please enter the security code shown above)
 

Comments and Moderation Policy

MaaMatiManush.tv encourages open discussion and debate, but please adhere to the rules below, before posting. Comments or Replies that are found to be in violation of any one or more of the guidelines will be automatically deleted.

  • Personal attacks/name calling will not be tolerated. This applies to comments or replies directed at the author, other commenters or repliers and other politicians/public figures. Please do not post comments or replies that target a specific community, caste, nationality or religion.

  • While you do not have to use your real name, any commenters using any MaaMatiManush.tv writer's name will be deleted, and the commenter banned from participating in any future discussions.

  • Comments and replies will be moderated for abusive and offensive language.

×

© 2017 Maa Mati Manush About Us  |  Contact   |   Disclaimer   |   Privacy Policy   |   Site Map