M3 Views

আধার কার্ড জরুরিঃ দ্বন্দ্ব যত আধার কার্ডের অপব্যবহার নিয়ে

অমিয় চৌধুরী  | November 13, 2013

আধার কার্ড। বিতর্কে ঢোকার আগে প্রাথমিক কিছু বলে নেওয়া যাক। আঁধার শব্দটি কোন শব্দের বা শব্দগুচ্ছের সংক্ষিপ্তকরণ নয়। প্রথমে শুনলেই মনে হয় আধার শব্দটি কোন কিছুর “অ্যাব্রিভিয়েশন”। আদপেই তা নয়। আধার শব্দটি যা অনেককিছু ধারণের একটি পাত্র। সাধারণ মানুষের মনে তাই হতে পারে। কিন্তু তাও নয়। রাষ্ট্র আর মানুষের সম্পর্ক একান্তভাবেই রাজনৈতিক। রাষ্ট্রযন্ত্রের উদ্দেশ্যই হল সামগ্রিকভাবে রাষ্ট্রের নাগরিকদের স্বচ্ছন্দে রাখা। এই কাজটি করতে গেলে প্রত্যেক নাগরিককে সম্পূর্ণভাবে বোঝা দরকার।

রাষ্ট্রের নাগরিকদের ভোটাধিকার আছে। কিন্তু ভোটার হতে গেলে নাগরিক হিসেবে একটা পরিচয়পত্র থাকা দরকার। অর্থনৈতিকভাবে রাষ্ট্র তার খরচ খরচা সামলায় অন্যান্য উপাদান ছাড়াও নাগরিকদের কাছ থেকে কিছু কর আদায় করে। যে ধরণের করই হোক না কেন, রাষ্ট্রের নাগরিক যারা একটি সীমিত আয়ের ওপরে আয় করেন, তার পঞ্জিকরন এর জন্যে একটা করে প্যানকার্ড দিয়ে থাকে। আয়কর দাতা হিসেবে এইটিই তার পরিচয়পত্র। দেশে যখন খাদ্যের অভাব ঘটে, তখন খাদ্য সামগ্রীর যোগান দেওয়াও রাষ্ট্রের কর্তব্য। কিন্তু রাষ্ট্রে তো শুধু নাগরিক সম্প্রদায়ই থাকে না। এখানে আইনগত ভাবে বহু বিদেশীও আসে। তাছাড়া অবৈধভাবে বহু মানুষ এই অনুন্নত বা অর্ধ উন্নত দেশে আসে রুটি রোজগারের প্রয়োজনে। তারা কোন পরিচয়পত্র বহন করেনা। অতএব তাদের রুটি রোজগার এবং খাওয়ানোর দায়িত্বও রাষ্ট্রের নয়। কিন্তু এই অবাঞ্ছিত মানুষজন যদি একটা রেশনকার্ড জোগাড় করে নিতে পারে সে যে ভাবেই হোক না কেন, রাষ্ট্রের ঘাড়ে তখন তাদের দায়িত্ব বর্তায়। এই ভাবেই একটা মানুষকে নাগরিক হিসাবে বিভিন্ন পরিচয়পত্র বহন করতে হয়। এমনকি হতদরিদ্র যারা, তাদের বিপিএল বা দারিদ্রসীমার নিচের মানুষ হিসাবে সস্তায় নিয়ন্ত্রিত মূল্যে খাদ্য বা ব্যবহার্য জিনিস কিনতে হয় এই বিপিএল কার্ড দেখিয়ে। কিন্তু এইসব পরিচয় পত্র এমনভাবে তৈরি, যে কোন মানুষ নিজের কারিগরি বা অপরের সাহায্যে নকল করতে পারে। এইসব কারণে রাষ্ট্র ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সমাজ জীবনেও তার প্রভাব পরে। তেমন অবস্থা থেকে মুক্তি পেতেই গত শতাব্দীর ন’য়ের দশক থেকেই চিন্তা ভাবনা শুরু হয়। অর্থাৎ কি করে নাগরিকদের একটা অভিন্ন এবং অনন্য পরিচয়পত্র দেওয়া যায়। যে পরিচয়পত্র কোনক্রমেই জাল করা সম্ভব নয়।

এই উপলক্ষেই ২০০৯ সালে ইউপিএ সরকার বিখ্যাত প্রযুক্তি গুরু নন্দন নীলকেনিকে ব্যাঙ্গালোর থেকে আমন্ত্রণ জানালেন। নীলকেনি মনে করেছিলেন আমাদের মত এত বড় একটা দেশে নাগরিকদের জন্য একটা জাতীয় পঞ্জী দরকার, এবং সঙ্গে সঙ্গে এমন একটা নাগরিক পরিচয় পত্র যেটা একটা সাংকেতিক বার্তা বহন করবে। যেহেতু সবসময়ই এই সব মানুষ – নীলকেনি বা শ্যাম পিত্রোদা এরা নতুন কিছু করতে অগ্রসর হলেই কোড বা কোন সাংকেতিক বার্তা বহনকারি একটা কিছু নাম ব্যবহার করেন। নীলকেনি জাতীয় নাগরিক পঞ্জীতে নিজ নিজ পরিচয় বহনকারিদের একটা করে বায়োমেট্রিক পরিচয় পত্র দেওয়ার সুপারিশ করলেন। বর্তমান এই পদ্ধতিতেই দেশের উৎসুক নাগরিকদের পাসপোর্ট তৈরি করা হয়। পাসপোর্ট তৈরির সময় মানুষের দু’হাতের দশ আঙ্গুলের ছাপ নেওয়া হয়ে থাকে এবং মানুষের চোখের মণির ছবি নেওয়া হয়। কেননা দুনিয়ার ভিন্ন ভিন্ন মানুষের আঙ্গুলের ছাপ আর চোখের মণির ভিন্নতা বিশ্বস্বীকৃত। এর কোন ‘ডবল’ হয় না। সরকারের কল্পনাকে বাস্তবায়িত করতে নীলকেনি এক পরিচয়পত্র তৈরি করলেন। এরই নাম আধার কার্ড। ইংরিজিতে একে বলা যেতে পারে – Unique Code of I.D অথবা Unique Code of Identification। বাংলা করলে দাঁড়ায় আধার একটি অনন্য সাংকেতিক বার্তা বহনকারী পরিচয়পত্র যা, যে কোন মানুষকে চিনিয়ে দেয়।

কিন্তু এই পরিচয় বহনকারি কার্ডটি এখন ভারতবর্ষের সর্বত্রগামী হয়ে উঠতে পারেনি। কেননা এখনও দ্বন্দ্ব কাটেনি। কোন সংস্থা নির্মাণ করবে এই বিশেষ ধরণের আধার কার্ড, সরকারের নিযুক্ত কোন বিশেষ সংস্থা অথবা ভারতের জনগণনা বিভাগ। ভোটার পরিচয়পত্রই যখন সেই ১৯৯৫ সাল থেকে আজ পর্যন্ত ৮০/৯০ শতাংশের বেশি মানুষ পায়নি, তখন আধার-এর অনন্য পরিচয়পত্র তৈরি করতে নিশ্চয়ই অনেক বেশি সময় প্রয়োজন। অথচ পেট্রলিয়াম দপ্তর ঘোষণা করে দেয় যে এবার থেকে ভর্তুকি সম্পন্ন গ্যাস সিলিন্ডার পেতে হলে আধার কার্ড জরুরি। গোলমালের সূত্রপাত ঠিক এইখানেই। আর পশ্চিমবঙ্গে এই ক্ষেত্রে সবচেয়ে আগে। পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী যখন বলেন – আধার কার্ড করা না থাকলে ভর্তুকি যুক্ত গ্যাস সিলিন্ডার পাওয়া যাবেনা, তখন একে কেন্দ্রীয় সরকারের, মানুষ ঠকানোর একটা পথমাত্র। যে কোন ভারতীয়কে তো বহুরকমের পরিচয়পত্র ব্যবহার করতে হয়। ভোটার কার্ড, প্যান কার্ড, অফিস পরিচয়পত্র, এটিএম কার্ড, ক্রেডিট কার্ড ইত্যাদি। একটা মানুষ কতগুলো কার্ড নিয়ে ঘুরবে। সাধারণ মানুষের কথা ভেবে কেন্দ্রীয় সরকারের উচিৎ তার গ্যাস সিলিন্ডার সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করা। সঙ্গে সঙ্গে বিরোধী পক্ষ সিপিএম এবং বঙ্গীয় কংগ্রেস রে রে করে উঠল। আধার কার্ডের সিদ্ধান্ত যখন হয় তখন মমতা তো প্রথমে সাংসদ পরবর্তী কালে মন্ত্রী ছিলেন তখন আপত্তি করেননি কেন। সিপিএমতো প্রথম থেকেই এই ব্যবস্থার বিরুদ্ধে ছিল। অতি কুযুক্তি। মমতা কখনই আধার-কার্ড এর বিরোধিতা করেননি। কেননা আধার তো এমন একটি কোড যা সমস্ত নাগরিকের অন্তস্থ পরিচয় বহন করে। তবে অর্থনৈতিক উদারিকরনের যুগে ঘুর পথে সরকার যে মানুষের ওপর বোঝা চাপিয়ে দেবে – এটা নিশ্চয়ই সমর্থন যোগ্য নয়। আর সিপিএম এর কথা বলা সাজেনা। আজ পশ্চিমবঙ্গের সমস্ত মানুষ জেনে গেছে – ভোটার কার্ডকে ওরা কি কদর্যভাবে ব্যবহার করেছিল।

< Back to List

 
Comments (0)
 
 
Post a Comment Comments Moderation Policy
 
Name:    Email:
 
Comment:
 
 
 
Security Code:
(Please enter the security code shown above)
 

Comments and Moderation Policy

MaaMatiManush.tv encourages open discussion and debate, but please adhere to the rules below, before posting. Comments or Replies that are found to be in violation of any one or more of the guidelines will be automatically deleted.

  • Personal attacks/name calling will not be tolerated. This applies to comments or replies directed at the author, other commenters or repliers and other politicians/public figures. Please do not post comments or replies that target a specific community, caste, nationality or religion.

  • While you do not have to use your real name, any commenters using any MaaMatiManush.tv writer's name will be deleted, and the commenter banned from participating in any future discussions.

  • Comments and replies will be moderated for abusive and offensive language.

×

© 2017 Maa Mati Manush About Us  |  Contact   |   Disclaimer   |   Privacy Policy   |   Site Map