M3 Views

প্রসঙ্গ দিল্লীর বিধানসভা: কেজরিওয়ালের রাজনীতির এক নতুন প্রকরণ

অমিয় চৌধুরী  | January 3, 2014

আমার কাছে ফেলে আসা ২০১৩র সবচেয়ে বড় ঘটনা দিল্লীর রাজনীতিতে কেজরিওয়াল-এর এক অন্য ধরণের রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব হিসেবে উঠে আসা। দিল্লী বিধানসভার ৭০টি আসন। এর মধ্যে বিজেপি পেল ৩২টি। কংগ্রেস মুছতে মুছতে ৪১ থেকে নেমে এল ৮টিতে। কংগ্রেস এর জন্যে এ এক লজ্জাজনক পরিস্থিতি। অতএব নিজের সত্ত্বা বাঁচিয়ে রাখতে কেজরিওয়ালের আম আদমি পার্টি বা আপ’কে নিঃশর্ত সমর্থন দিতে হল। কেননা আগামী ২০১৪র সংসদীয় নির্বাচনে কংগ্রেসকে বিজেপি না-মানুষ নাচে নাচিয়ে দিতে পারে।

প্রথম সংখ্যা গরিষ্ঠ দল হিসেবে উপ-রাজ্যপাল (যেহেতু দিল্লী এখন পরিপূর্ণ রাজ্যের মর্যাদায় ভূষিত নয়) শ্রী নাজিব জঙ ডাকলেন বিজেপিকেই। দিল্লীতে গত প্রায় দু’বছর থেকে দুর্নীতি বিরোধী ঝড়ের দাপট আস্তে আস্তে মিইয়ে এলেও বিজেপি জাতীয় স্তরে বৃহত্তর লাভের আশায় দল ভাঙ্গাভাঙ্গি খেলার দিকে যেতে সাহস পেল না। সরাসরি উপরাজ্যপালকে জানিয়ে দিল ৩২টি আসন নিয়েও তারা সংখ্যাগরিষ্ঠতার প্রমাণ দিতে পারবে না। বাধ্য হয়েই উপরাজ্যপাল নাজিব জঙ ‘২৮শে’ কেজরিওয়ালকে সরকার গড়তে বললেন। কেজরিওয়াল ততক্ষণে কংগ্রেসের ৮ বিধায়কের সমর্থন পেয়ে গেছেন। কিন্তু অরবিন্দ দশদিন সময় চেয়ে নিয়েছিলেন। প্রচণ্ড দুর্নীতিগ্রস্ততার দায়েই তো তাদের মূখ্যমন্ত্রী শীলা দীক্ষিত অরবিন্দ কেজরিওয়াল-এর কাছে প্রায় ২৬ হাজার ভোটে হেরেই হেরেই শুধু যায়নি, সমগ্র কংগ্রেস দলটি ক্ষীয়মাণ হয়েছে। কংগ্রেস-এর ১৫ বছর ধরে রাজত্ব করা বিধায়করা প্রায় নিশ্চিহ্ন। তাদের আসনগুলোই চলে গেছে আম আদমির ঝোলাতে। দুর্নীতিগ্রস্ত রাজনীতিকে ঝেটিয়ে বিদায় করবার জন্যই কেজরিওয়াল এবং তার রাজনীতির সঙ্গী সাথীরা ঝাঁটাকে দলীয় পতাকার প্রতীক করে রাজনীতিতে নেমেছিলেন। এখন অথচ সেই দুর্নীতিগ্রস্ত কংগ্রেস-এর সাহায্য নিয়ে সরকার গড়া। লোকে মানবে কেন? এই চিন্তাই কেজরিওয়াল, যোগেন্দ্র যাদব ইত্যাদিকে রীতিমত ভাবিয়েছিল। কেননা ওরা যখন ওদের ৭০ জন প্রার্থী নিয়ে নির্বাচনে নামেন, তখনই দেখা গেল প্রার্থীদের মধ্যে এক/দুজন দুর্নীতিতে আক্রান্ত প্রার্থীকে ওরা সঙ্গে সঙ্গে বাতিল করে দেন। জনমানসে আম আদমি পার্টির ভাবমূর্তি উজ্জ্বলতর করবার মানসে ওরা ভারতবর্ষের রাজনীতির চেনা ছকটা ভেঙ্গে দিলেন।

জোট ঘোটের রাজনীতিতে এ এক অকল্পনীয় রাজনীতির খেলা। এ হয়ত সেই চেনা খেলা ভাঙ্গার খেলা। এর জন্য কেজরিওয়ালকে কম রাস্তা পরিক্রমা করতে হয়নি। বাধাও এসেছে বিভিন্ন ভাবে। অসম্ভব ধী সম্পন্ন ছাত্র, পরে উঁচু পদে আসীন আমলাগিরি ছেড়ে সমাজের অভ্যন্তরে এবং প্রান্তিক স্তরে ঘুরে ঘুরে সব দেখেছেন। ওকে সম্ভবত প্রথম দেখা গিয়েছিল আন্না হাজারের অনশন মঞ্চে। রাজনীতি থেকে দুর্নীতি মুক্ত করতে একটা জনলোকপাল বিল করাবার জন্য গান্ধীজির মত অনশন শুরু করেছিলেন অন্না রামলীলা ময়দানে। মনে রাখতে হবে, যে কেউই গান্ধী হতে পারেন না। আর রাজনীতির দুনিয়াটাও অনেক বদলে গেছে। সামাজিক স্তরে আন্দোলন করেই রাজনীতিকে শুদ্ধ করা যায় এই ধারণা কখন কখন সত্য হলেও, কালো কুৎসিত রাজনীতির দাপটে, সমাজই কখনো নিশ্চুপ হয়ে যায়। কেজরিওয়াল অন্যরকম ভেবেছিলেন। রাজনীতিতে নেমে, দুর্নীতিতে ভরা সমাজপতিদের মধ্যে এক অভিঘাত ঘটে যায়। এখানেই আন্নার সঙ্গে অরবিন্দ’র তফাৎ। আন্নাও গান্ধী নন। গান্ধীজি, সুভাষ চন্দ্র বোসের সঙ্গে ভিন্ন মত এবং পথের দিশারী হয়েও, সুভাষের শেষ পর্যায়ের লড়াইকে অমর্যাদা করেননি। অথচ আন্না হাজারে অরবিন্দ কেজরিওয়াল-এর রাজনীতির প্রাঙ্গনে উত্তরণ মেনে নিতে চাননি। বরং বলেছেন তার অনশন মঞ্চে যে কোটি কোটি টাকা উঠেছিল তার হিসেব কোথায়? যদিও অরবিন্দকে ব্যক্তিগত ভাবে অসৎ বলেননি। কিন্তু তবু অপ্রত্যক্ষভাবে অরবিন্দের রাজনীতির এক রকম বিপক্ষে চলে যান। কেজরিওয়াল তখন বলেন আন্না আর তার সম্পর্ক গুরু আর শিষ্যের মত। এ কথা মেনে নিয়েও অরবিন্দ বুঝেছেন দুর্নীতি, জাতপাত, ধর্মীয় বিভেদ এবং ধনী দরিদ্রের ফারাকে অভিশপ্ত এই সমাজের মধ্যে এক বিপুল মন্থন প্রয়োজন। আর সেই মন্থন প্রক্রিয়া শুরু করবার মানবিক মন্ত্র একমাত্র রাজনীতি। তবে বর্তমান কলঙ্কিত রাজনীতির মন্থন শুরু কিভাবে সম্ভব, অরবিন্দ কেজরিওয়াল, তার সঙ্গিসাথী এবং নতুন দল আপ, দিল্লীর নির্বাচন মঞ্চেও সেইটিই করে দেখালেন।

এই জন্যেই প্রয়োজন এক পোক্ত সরকার। কংগ্রেস প্রথমে কেজরিওয়ালের হবু সরকারকে নিঃশর্ত সমর্থ দেওয়ার আশ্বাস দিয়েও পরবর্তীতে ইস্যু ভিত্তিক সমর্থনের কথা বলে। কেজরিওয়াল কিন্তু দুর্নীতিগ্রস্ত কংগ্রেস বা বিজেপির সমর্থন চায়নি। কিন্তু সমর্থন না নিলে সরকারও গড়া সম্ভব নয়। কেজরিওয়াল বিরোধী আসনেই বসতে চেয়েছিলেন। এবার তিনি কংগ্রেস-এর সমর্থন নিয়ে সরকার গড়বেন কিনা, তার জন্যে জনমত যাচাই করতে অগ্রসর হলেন। ইলেক্ট্রনিক্স মিডিয়ায় লক্ষ লক্ষ মানুষের মতামত জানলেন। আর কেজরিওয়ালের নেতৃবৃন্দ সরাসরি চলে গেলেন দিল্লী ২৮০টি মোহল্লায়। এর মধ্যে ২৫৪ মোহল্লার অধিকাংশ মানুষই সরকার গঠনের পক্ষে রায় দিলেন। এ অনেকটা স্ক্যান্ডিনেভিয়ান, বিশেষ করে সুইস শাসন ব্যবস্থার ‘রেফারেন্ডাম’-এর মত। এটা কেজরিওয়ালদের মত করে ভারতীয় রাজনীতির এক নতুন দিক্‌দর্শনের ইঙ্গিত। এখন কেজরিওয়ালদের লক্ষ্য ভারতের সংসদীয় ব্যবস্থায় ঢুকে সংসদীয় প্রকরণগুলির মাধ্যমে বর্তমান অবস্থায় এক শুদ্ধিকরণ ব্যবস্থা চালু করা। কেজরিওয়াল ও আপ কতটা সার্থক হবে তা ভবিষ্যৎ বলবে। তবে আপাতত কেজরিওয়াল ভারতীয় রাজনীতিতে একটা নতুন ‘ইডিয়াম’ অর্থাৎ বর্তমান রাজনীতির মধ্যে এক নতুন চলন-এর উদ্ভব করলেন। একদা গান্ধীজি যা করেছিলেন। যাকে বলা হয়ে থাকে, রাজনীতিকে ‘সেন্টলি ইডিয়াম’ এর দ্বারা সংজ্ঞায়িত করা। এরই ফলশ্রুতি অহিংস রাজনীতি। সব জায়গায় এই নীতি সফল না হলেও গান্ধী কর্তৃক দেখানো অহিংস রাজনীতির প্রাসঙ্গিকতা আজও কিন্তু কেউ অস্বীকার করতে পারে না। নিন্দুকেরা বা সমালোচকরা যাই বলুক না কেন, পশ্চিমবঙ্গের বর্তমান মূখমন্ত্রীও সেই ১৯৯০ সাল থেকেই গান্ধীজির প্রদর্শিত পথ অনুসরণ করেই ‘তথাকথিত বাম দূর্গের’ অচলায়তন চুরমার করে ক্ষমতায় এসেছিলেন। দিল্লীর ২৮টি আসন লাভ কিছু ইঙ্গিত করেনা। তবে তার পদ্ধতিটা ছিল অজানা। এপ্রিল-মে মাসের লোকসভা নির্বাচনে আম আদমি পার্টি ৩০০টি আসনে প্রার্থী দেবে। অরবিন্দর আপ, যে ভাবে রাজনীতির প্রক্রিয়া প্রকরণ চালু করে এক নতুন ভাষার দিকে অগ্রসর হচ্ছেন, তাতে প্রকৃত পক্ষেই বিজেপি এবং কংগ্রেস যারা বিপুল বিকৃতির ওপর দাড়িয়ে রাজনীতি করছে, এই দুই দলই এখন যথেষ্টই সন্ত্রস্ত। আর কিছু না হলেও এটাই বা কম কি!



< Back to List

 
Comments (0)
 
 
Post a Comment Comments Moderation Policy
 
Name:    Email:
 
Comment:
 
 
 
Security Code:
(Please enter the security code shown above)
 

Comments and Moderation Policy

MaaMatiManush.tv encourages open discussion and debate, but please adhere to the rules below, before posting. Comments or Replies that are found to be in violation of any one or more of the guidelines will be automatically deleted.

  • Personal attacks/name calling will not be tolerated. This applies to comments or replies directed at the author, other commenters or repliers and other politicians/public figures. Please do not post comments or replies that target a specific community, caste, nationality or religion.

  • While you do not have to use your real name, any commenters using any MaaMatiManush.tv writer's name will be deleted, and the commenter banned from participating in any future discussions.

  • Comments and replies will be moderated for abusive and offensive language.

×

© 2017 Maa Mati Manush About Us  |  Contact   |   Disclaimer   |   Privacy Policy   |   Site Map