M3 Views

তেলেঙ্গানা বিল অসাংবিধানিক এবং পরিষদীয় গনতান্ত্রিক নিয়ম বিরোধী এক পরিহাস

অমিয় চৌধুরী  | February 27, 2014

অন্ধ্রপ্রদেশ রাজ্যকে ভাগ করা হয়ে গেল একটা তেলেঙ্গানা-স্বতন্ত্র রাজ্য বিল সংসদে পাশ করিয়ে। এই বিলে এখন রাষ্ট্রপতি সাক্ষর করলেই আইনত অন্ধ্র প্রদেশ দুটি আলাদা রাজ্যে পরিণত হয়ে যাবে। তেলেঙ্গানার আন্দোলন দীর্ঘ দিনের। ১৯৫০ এর দশক থেকেই অন্ধ্র বিভাজনের দাবি ছিল। সেই ইতিহাস দীর্ঘদিনের। এই আলোচনায় সেই সব প্রসঙ্গ না আনাই ভালো। পরে ১৯৬৯, ১৯৭২ এবং ২০০৪ এ এই দাবি উঠেছে। দাবার ভাষায় যাকে স্টেলমেট বলে সেই অবস্থায় পরে ছিল এতদিন। বহুবার দাবি আদায়ের জন্য তেলেঙ্গানা অঞ্চলের মানুষ অনশন ধর্মঘট করেছে। বহু যুবক আত্মাহুতি দিয়েছে। শেষ পর্যন্ত অন্ধ্রবিভাজন হয়নি। ১৯৫০র দশকে রাজ্য বিভাজন কমিশন, ব্রিটিশ শাসিত প্রদেশগুলোকে যতদূর সম্ভব ভাষার ভিত্তিতে ভাগ করেছিল। সেই ভাষার মানদন্ড কার্যকর করলে কিন্তু অন্ধ্রপ্রদেশকে ভাগ করা যায় না। ওখানে তিনটি অঞ্চল তেলেঙ্গানা, সীমান্ত্র এবং রায়ালসীমার ভাষা তেলেগু।

কেন্দ্রের ইউপিএ-২ সরকার যার নেতৃত্বে কংগ্রেস অন্ধ্রপ্রদেশকে ভাগ করে দিল ২০১৪ সালে ফেব্রুয়ারিতে অথচ কংগ্রেস-এর কাছে এই দাবি উঠেছিল ২০০৯ সালের নির্বাচন পর্বে। ঠিক তার পাঁচ বছর পর কংগ্রেস তার ১২৮ বছর বয়সের সময় আর বোঝা বইবার ক্ষমতা নষ্ট হচ্ছে ভেবে ২০১৪ ফেব্রুয়ারি সংসদের দুই কক্ষেই অগনতান্ত্রিক ভাবে এবং বেআইনি পদ্ধতিতে দুই কক্ষেই বিলটা পাশ করালো। এত বড় একটা গুরুত্বপূর্ণ বিল, যার রাজনৈতিক অভিঘাত অকল্পনীয়, ধ্বনি ভোটে পাশ হয়ে গেল। আর কংগ্রেস জোট সরকারের রাজনৈতিক উদ্দেশ্য আর কারুর কাছে গোপন থাকল না। কংগ্রেস আর প্রধান বিরোধী দল ভারতীয় জনতা পার্টির পর্দার আড়ালের কারুকৃত আজ সমস্ত ভারতবাসীর কাছে প্রকট। প্রখ্যাত এই বিল আনা সম্পূর্ণ বেআইনি এই অর্থে যে সমস্ত প্রস্তুতিটা নেওয়া হয়েছিল শুধুমাত্র কংগ্রেস-এর দলীয় সিদ্ধান্তে জোট শরিকদের অগোচরে। নেতৃত্বে কংগ্রেস থাকলেও এটা একটা জোট সরকার। প্রাথমিকভাবে কখনোই অন্যান্য জোট শরিকদের সঙ্গে কোন খোলা মেলা আলোচনাই হয়নি। তবু তারা বিলটিকে সমর্থন করেছে কেননা ওদেরকে স্বপনে শয়ানে সিবিআই-এর জুজু দেখানো হয়।

২০১৪ সালে দেশব্যাপি সাধারণ নির্বাচন যখন এগিয়ে এসেছে ঠিক তখনই সমগ্র অন্ধ্রের স্বার্থ বিসর্জন দিয়ে তেলেঙ্গানা থেকে আট দশটি মাত্র আসনের জন্য এই কর্মটি করা হল। ভারতের মানুষজনও বুঝে গেছে যে এই ১২৮ বছরের লোলচর্ম আত্ম কন্ডুয়নসর্বস্ব কংগ্রেসকে দিয়ে আর লাভ হবেনা দেশে। কেননা ভোটে এবার কংগ্রেস হারছে। ক্ষমতা যা ওরা গত দশ বছর ধরে শরিকদের সবাইকে এপিট ওপিট করে, শুধু কিছু দুর্নীতির সম্পদ নিয়ে ট্রাপিজ-এর খেলা দেখিয়ে গেছে। ক্ষমতা হারানোর ভয়ে যে কোন অনৈতিক কৌশল এবং বেআইনি পদ্ধতি অবলম্বন করে শুধু টিকে থাকতে চাইছে। ওদের কৃত-কর্মের জন্য অন্যান্য রাজ্য ক্ষতিগ্রস্ত হয় তাতে আপাতত ওদের কোন হেলদোল নেই। এখনিতো মায়াবতী দাবি করেছে উত্তরপ্রদেশকে ভাগ করে আরো চারটি রাজ্য করে দেওয়া হোক। মহারাষ্ট্রে অনেকদিন থেকেই মহারাষ্ট্র দ্বিখন্ডিত করে স্বতন্ত্র বিদর্ভ রাজ্য করা হোক। ২০১৩ জুন মাসের পরবর্তীতে গোর্খাজনমুক্তি মোর্চা পশ্চিমবঙ্গ থেকে পৃথক হয়ে গোর্খাল্যান্ড রাজ্যের জন্য আবার আন্দোলন শুরু করেছিল। যে প্রশাসনিক এবং রাজনৈতিক ক্ষমতা ও দক্ষতা নিয়ে পশ্চিমবঙ্গের মূখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় গোর্খাল্যান্ড আন্দোলনকে রোধ করেছিলেন তা যথেষ্ট প্রশংসনীয় ছিল। তেলেঙ্গানা সৃষ্টি হওয়ার পর বিমল গুরুঙরা আবার কিভাবে এগোয় সেটাও লক্ষণীয়।

এইভাবে কংগ্রেস বা বিজেপি ভাই ভাই হয়ে শেক্সপীরিয়ান "ফেয়ার অব ফাউল" পদ্ধতিতে রাজ্য ভাগ করে তবে তাকে বলকানায়ন ছাড়া আর কি বলা যাবে। অবশ্য পৃথিবীর বৃহৎ শক্তিগুলো – চীন, আমেরিকা ভারতকে বলকানায়নই করতে চায়। দুনিয়াদারি করতে এই বড় রাষ্ট্রগুলি উঠে পরে লাগবে সম্ভবত, বহুখন্ড বিশিষ্ট ভারতবর্ষকে দূর্বল করে দিতে। ভারতকে ওদের তাঁবেদারই থাকতে হবে। প্রশংসনীয় যে তেলেঙ্গানা বিল উদযাপনের বিরুদ্ধে চিনের তাঁবেদার হয়ে সিপিএম কিন্তু সমর্থন যানায়নি। সত্যিকারের বিরোধিতায় দুই কক্ষেই তৃনমূল কংগ্রেস শেষ পর্যন্ত লড়ে গেছে। রাষ্ট্রপতির কাছে গিয়ে ওরা এই বিলে রাষ্ট্রপতি যাতে সাক্ষর না করেন তার জন্য স্মারকপত্রও দিয়ে এসেছে। আর এই বিল পাশ করাতে গিয়ে কংগ্রেস দলও দ্বিখন্ডিত হয়েছে। লোকসভার ১৭ জন মন্ত্রী এবং সদস্যাকে সাময়িক বরখাস্ত করতে হয়েছে। অন্ধ্রবিধান সভা আড়াআড়ি ভাবে দ্বিখন্ডিত। মূখ্যমন্ত্রী কিরণকুমার রেড্ডিও পদত্যাগ করেন। কংগ্রেস কি এখনো আর মাত্র দু'মাস পরের নির্বাচনী ময়দানে দাঁড়িয়ে আকাশে সিঁদুরে মেঘ দেখতে পাচ্ছেনা!

এই বিল পাশ করাতে গোপনে মাঠে নেমেছিল বিজেপিও। আর দশ বছর ধরে দুর্নীতিগ্রস্ত কংগ্রেস শেষ জুয়া খেলায় নেমেছিল। যে কোনভাবে পরবর্তী সংসদের শেষ অধিবেশনে "আমার পরে সব ধ্বংস"- এই মনোভাব নিয়েই খেলে গেল কংগ্রেস। অর্থাৎ এইভাবে যদি খড়কুটোও ধরা যায়, কেননা ২০১৪ নির্বাচন কংগ্রেসের রাতের ঘুম কেড়েছে। একই সঙ্গে নিম্নকক্ষের স্পিকার, অন্যান্য সভা পরিচালকরা এবং রাজ্যসভার সভাপতিও জড়িয়ে পড়লেন। অর্থাৎ এরা প্রমাণ করলেন, যে এরা দলীয় সমর্থন পুষ্ট নরম শিরদাঁড়া বিশিষ্ট। কৌশলী কংগ্রেস নেতারা এই বিলটিকে কম ঝামেলায় রাজ্য সভায় পাশ করিয়ে নিতে চান। বাধা হয়ে দাঁড়ায় বিলটির অর্থনৈতিক কয়েকটি ধারা। রাজ্যসভায় বিলটি একবার পাশ হয়ে গেলে, লোকসভা ভেঙ্গে গেলেও পরবর্তী লোকসভায় বিলটি বাতিল হয়ে যায়না। অতএব প্রথমে অতিদ্রুত লোক সভাতেই অনৈতিক তো বটেই বেআইনিভাবেই বিলটি আসে। দ্বিতীয়ত- লোক সভার বিজ্‌নেস অ্যাডভাইসারি কমিটিতে বিলটি পেশের কোন উল্লেখই ছিলনা। অথচ এতবড়, বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ বিল সদস্যদের অগোচরে 'সাপ্লিমেন্টারি' বিষয় হিসেবে আনা হয়। প্রচন্ড হইহট্টগোলের মধ্যে সভা পরিচালক, মন্ত্রী বিলটি পেশ করেছেন বলে ঘোষণা করেন। কিছু কংগ্রেস সদস্য এবং বিল বিরোধীরা ওয়েলে নেমে আসে এবং বিল বিরোধী সদস্যরা প্রতিবাদ করতে থাকেন। গোলমরিচের গুড়ো স্প্রে করেন। সেক্রেটারি জেনারেল এর মাইক্রোফোন ভেঙ্গে অস্ত্রের মত ব্যবহারে উদ্যত হন। বেশ কয়েকজন আহত হয়ে হাসপাতালে যান। বিল সমর্থন করলেও অগনতান্ত্রিক পদ্ধতিগত ত্রুটির কথা উল্লেখ করে গোলমাল শুরু করেন। বিলটি পাশ করাতে হবেই কেননা কংগ্রেসনেত্রী সোনিয়া গান্ধী যে তাই চান। শেষকালে বিলটি কোন সংশোধনী ছাড়াই ভয়েস ভোটে পাশ হয়ে যায়। নিয়ম হল একজন সদস্যও যদি ডিভিশন দাবি করেন, তবে সভাধ্যক্ষ তা মানতে বাধ্য। কিন্তু সভা পরিচালক বিলটি পাশ করিয়ে দিলেন। এমনকি সদস্যরা জানতেও পারে নি যে বিলটি কখন পেশ করা হয়েছিল। লোক সভার অধিবেশনে কংগ্রেস সরকারের এটি একটি ন্যাক্যার জনক ঘটনা। লোকসভার এই কলঙ্কজনক অধ্যায়ে সভা কক্ষের সব দরজা বন্ধ করে, টিভি সম্প্রচারও বন্ধ করে দেওয়া হয়। দুদিনের মধ্যেই সীমান্ত্র, রায়ালসীমা অঞ্চলের বঞ্চনার কথা স্মরণে না রেখে রাজ্য সভাতেও বিলটি পাশ হয়। এই অধ্যায়ে বিজেপিও নোংরা খেলায় অংশগ্রহণ করেছে। কিছু সংশোধনী প্রস্তাব আনে। অথচ বিলটি যখন পাশ হচ্ছে, তখন সংশোধনীর পক্ষে কোন ভোট দাবি করেনি। লোক সভায় কোন আলোচনাই হয়নি। তবে রাজ্যসভায় কিছু আলোচনা হলেও রাতের অন্ধকারে বিলটি ডিভিশনের দাবি ছাড়াই এই অনৈতিকতা কে স্বীকৃতি দেওয়া হয়।

< Back to List

 
Comments (0)
 
 
Post a Comment Comments Moderation Policy
 
Name:    Email:
 
Comment:
 
 
 
Security Code:
(Please enter the security code shown above)
 

Comments and Moderation Policy

MaaMatiManush.tv encourages open discussion and debate, but please adhere to the rules below, before posting. Comments or Replies that are found to be in violation of any one or more of the guidelines will be automatically deleted.

  • Personal attacks/name calling will not be tolerated. This applies to comments or replies directed at the author, other commenters or repliers and other politicians/public figures. Please do not post comments or replies that target a specific community, caste, nationality or religion.

  • While you do not have to use your real name, any commenters using any MaaMatiManush.tv writer's name will be deleted, and the commenter banned from participating in any future discussions.

  • Comments and replies will be moderated for abusive and offensive language.

×

© 2017 Maa Mati Manush About Us  |  Contact   |   Disclaimer   |   Privacy Policy   |   Site Map