M3 Views

আন্না হাজারেজী, সততাই গান্ধী দর্শনের মূল কথা

অমিয় চৌধুরী  | March 26, 2014

২০১৪’র সংসদীয় নির্বাচনে অনেক অঘটন ঘটতে চলেছে। সব রাজনৈতিক দলই, যে যাই ঘোষণা করুক, একটা অনিশ্চয়তায় ভুগছে। জনমত সমীক্ষাগুলোতে অবশ্য একটা ইঙ্গিত পাওয়া যায়। কংগ্রেস-এর নেতৃত্বে ইউপিএ জোট অনেকটা পিছিয়ে আর বিজেপির নেতৃত্বে(পড়ুন নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বে) এন ডি এ জোট অনেক দূর পর্যন্ত এগোলেও কাঙ্খিত সংখ্যায় পৌছাতে পারবেনা। এই ক্ষেত্রে বেশ কিছু আসন নিয়ে আঞ্চলিক দলগুলোর গুরুত্ব অনেকটা বেড়ে যাবে সরকার গঠন প্রক্রিয়ায়। এমনকি সেই ১৯৯৬-এর ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি হতে পারে। তবে তাহলে এবার সেটা হাস্যকর পর্যায়ে চলে যাবে। ভারতের যে রাজনৈতিক দলগুলো - সে জাতীয়ই হোক বা আঞ্চলিক - এগিয়ে এসেছে তাদের তাদের নেতৃবৃন্দের মধ্যে সততা খুঁজতে যা খড়ের গাদায় ছুঁচ খুঁজতে যাওয়ার সমান। ঠিক এই জায়গাতেই ভারতের এই নির্বাচনে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় একটা গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে রয়েছেন। তার সৎ, সাধারণ, আর মানুষের প্রতি ভালোবাসার স্নিগ্ধ জীবনচর্চা প্রশ্নাতীত ভাবে উঠে আসছে। ব্যক্তিগত সততা আর রাজনীতিক সততা বর্তমান সময়ে আর এক নয়। এই দুটো ক্ষেত্রেই পশ্চিমবঙ্গে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় প্রায় একক অবস্থানে। সেই ১৯৯০ সাল থেকে ক্রমাগত এগিয়েছেন। গান্ধীবাদী সমাজকর্মী আন্না হাজারের চোখে তাই মমতা একমাত্র নেতা যিনি দুর্নীতির পাঁকগ্রস্ত রাজনৈতিক নেতৃত্বে যোগ্য আগামী প্রধানমন্ত্রী। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ও আন্না হাজারের প্রতি একটা অমলিন শ্রদ্ধাপোষণ করতেন।

আন্না হাজারে বর্তমান ইউপিএ সরকারের পাহাড় প্রমাণ দুর্নীতি মানুষের সামনে তুলে ধরেন। দুর্নীতি দূরীকরণের জন্যে জন লোকপাল আইনের খসড়া হাতে করে দিল্লীর রামলীলা ময়দানে অনশনে বসলেন। কেন্দ্রীয় সরকারের নানান দুর্নীতি আর কেলেঙ্কারির প্রশ্নে জনগন ক্ষুব্ধ, উত্তেজিত। এই একটামাত্র ইস্যুতেই দিল্লীতে তো বটেই দূরদূরান্ত থেকে সাধারণ মানুষ এসে রামলীলা ময়দানে দিয়েছিল। গান্ধী টুপি মাথায় নিয়ে বসে আছেন আন্না তার আমরণ অনশনে। মঞ্চে নামী ধামি ব্যক্তিত্ব এমনকি যোগগুরু রামদেবও। কিরণ বেদী, প্রশান্ত ভূষণ আরও অনেকে বক্তিতায় বক্তিতায় মঞ্চ কাঁপাচ্ছেন। নেতৃত্বে থাকা কংগ্রেস সরকারও ভয় পেল। জন লোকপাল আইন পাশ করাবেন প্রতিশ্রুতি দিয়ে আন্নার অনশন ভাঙ্গালেন। ২০১১ সালের এপ্রিল-এর প্রথম সপ্তাহ একটা স্মরণীয় সময় হয়ে থাকলো। মহারাষ্ট্রে ফিরলেন আন্না হাজারে। ১৫তম সংসদের শেষ লগ্নে সরকার প্রায় জোর করেই একটা লোকপাল আইন পাশ করালেন, অবশ্য জেনে শুনেই যে এই আইন কার্যকর করা দুরূহ। আন্নার ধারণা ছিল যে একটা সর্বজনহিতে জনলোকপাল আইন থাকলেই সব দুর্নীতি দূর করা যাবে। বিগত দুবছরের বেশি সময় ধরে সেই এপ্রিল ২০১১’র রামলীলা ময়দানে তার সমর্থনে লাখো লোকের সমাবেশের স্মৃতি নিয়ে মশগুল হয়ে থাকলেন। মনে মনে ভাবলেন তার দুর্নীতি বিরোধী মঞ্চে আবারও হাজার হাজার লোক হাজির হয়ে যাবে।

এখানে একটা জরুরি প্রশ্ন ওঠে। আন্না বোধ হয় সামাজিক প্রক্রিয়ার রাজনীতির ভূমিকা স্বীকার করতে অস্বীকার করেছেন অথবা ঠিকমত অনুধাবন করেননি। অপর দিকে গান্ধী কিন্তু চলমানতায় আপাদ মস্তক এক রাজনীতিক হয়ে উঠেছিলেন। এখন আর এই সত্যে পৌছতে আর কোন বিতর্ক থাকার কথা নয়। আন্না হাজারে সামাজিক এবং গ্রামীণ অর্থনৈতিক কাজকর্ম করেছেন, তার এখনকার বিখ্যাত হয়ে ওঠা রালেগাঁও সিদ্ধি। নানাবিধ কাজকর্মের মধ্যে এবং বহু নেতৃত্ব স্থানীয় লোকের আনাগোনায় আন্না হাজারে বোধ হয় ভুলে গেছেন। তিনি গান্ধীবাদী গঠনাত্মক সমাজকর্মী হলেও তিনি গান্ধী নন। এই সিদ্ধান্ত এখন সব মানুষেরই। অবশ্য এই প্রশ্ন এখানে তোলার একটাই কারণ। যাই ঘটুক না কেন গান্ধীদের মত মানুষের সততা অভিধাটা মানুষকে আত্মস্থ করে নিতে হবে। যদিও এটা একটা আদর্শমাত্র। তবে আসল গান্ধী নিজে এই আদর্শের কাছে পৌছতে চেষ্টা করেছিলেন। তার দর্শন চিন্তার প্রতিপাদ্য হয়ে উঠেছিল “সত্যই ঈশ্বর”। অনেকটা সত্যই সুন্দর, সৌন্দর্যই সত্য। সেই ঈশ্বরকে বাইরে খুঁজতে হবেনা। তবে নিজের সততাকে জনগনের কাছে গ্রাহ্যমান করে তোলা চাই। বর্তমানের গান্ধীবাদী আন্নার কাছে গান্ধীর এই আত্ম দর্শন প্রকট হয়ে ওঠেনি। অবস্থানই বা কোথায়।

তবে তাকে অবশ্যই ধন্যবাদ। তিনি কিছু সৎ মানুষকে রাজনীতির আঙিনায় এককভাবে হলেও খুঁজতে চেষ্টা করেছিলেন। সেই জায়গা থেকে মূল্যায়ন করে মমতার মধ্যে, মমতার জীবনচর্যার মধ্যে তিনি একজন সৎ প্রধানমন্ত্রী খুঁজতে চান। আন্না বলেছিলেন এই সময়ে মমতাই প্রধানমন্ত্রী হওয়ার যোগ্য। তবে তাকে অন্তত আরও একশজনের সমর্থন আদায় করতে হবে। মমতার দূত মুকুল রায় আর কে ডি সিংহকে দিল্লীর রামলীলা ময়দানে এক জনসমাবেশ করতে বলেছিলেন মার্চের ১২ তারিখে। মুকুল রায়, ডেরেক ও’ব্রায়েনরা কোন ত্রুটি করেননি। ১১ তারিখ দিল্লীতে পৌঁছন মমতা। আন্নার সঙ্গে দেখা করে তার শ্রদ্ধার্ঘ জানিয়ে এসেছিলেন। আন্না হাজারে আর মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়-এর মিলিত জনসভার আয়োজন করে তৃনমূল কংগ্রেস-এর নেতৃবৃন্দ। কিন্তু তৃনমূল ইচ্ছে এবং চেষ্টা করলে অবশ্যই পারত। দিল্লী হরিয়ানা পশ্চিম উত্তর প্রদেশ এবং বাংলা থেকে লোক নিয়ে মাঠ ভরিয়ে দিতে। মমতা সহ সাধারণ মানুষও বিশ্বাস করেছিল। আন্না হাজারে আত্ম কণ্ডূয়নে বিগত ঝড় তোলা সেই আন্নাতেই আছেন। অতএব লোক যোগাড় করার বাড়তি কাজটি করলেন না।

১২ মার্চ দেশের লোক অধীর আগ্রহে চেয়ে ছিলেন কি কি হয়। মমতা হাজির সময়মত। তখনো সামনে পাতা চেয়ারগুলো ভরেনি। অনেকক্ষণ অপেক্ষা করেও দেখা গেলো আন্না তার কথার এবং আত্ম সততার খেলাপ করলেন। অজুহাত দিলেন অসুস্থতার। এ অসুস্থতা নিতান্তই রাজনৈতিক। দেখলেন লোক হয়নি, মাঠ ভরেনি। সন্ধ্যায় ‘প্রেস মিট’ করলেন। বললেন মমতাকে সমর্থন করেন কিন্তু মমতার দল কে নয়। এক সমাজকর্মী আন্না হাজারে বিভ্রান্ত রাজনীতিক-এ পরিণত হলেন। অর্থাৎ গান্ধীর সততায় বিশ্বস্ত না হয়ে তিনি আত্ম অবমাননা করেছিলেন সেদিন। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়-এর কাছে আন্নাজির সততা অনেকটা উল্কা ধ্বংসের মতো। মমতার সেই জেদ কিন্তু রয়ে গেছে। মমতা এখনও তার ভূমিকা সম্পর্কে নির্দ্বিধায়, ২২ এপ্রিল দলের ম্যানিফেস্টোয় ভারতবর্ষের ম্যাপ দিয়ে আগামী ভারতীয় রাজনীতির মমতাময় নির্ণায়ক ভূমিকাই বোঝাতে চেষ্টা করেছেন।

< Back to List

 
Comments (0)
 
 
Post a Comment Comments Moderation Policy
 
Name:    Email:
 
Comment:
 
 
 
Security Code:
(Please enter the security code shown above)
 

Comments and Moderation Policy

MaaMatiManush.tv encourages open discussion and debate, but please adhere to the rules below, before posting. Comments or Replies that are found to be in violation of any one or more of the guidelines will be automatically deleted.

  • Personal attacks/name calling will not be tolerated. This applies to comments or replies directed at the author, other commenters or repliers and other politicians/public figures. Please do not post comments or replies that target a specific community, caste, nationality or religion.

  • While you do not have to use your real name, any commenters using any MaaMatiManush.tv writer's name will be deleted, and the commenter banned from participating in any future discussions.

  • Comments and replies will be moderated for abusive and offensive language.

×

© 2017 Maa Mati Manush About Us  |  Contact   |   Disclaimer   |   Privacy Policy   |   Site Map