M3 Views

সাম্প্রতিক সংসদীয় নির্বাচনঃ অভাবনীয় সাফল্য নরেন্দ্র মোদীর আর কংগ্রেস এর অধঃপতন ঠেকেছে মাত্র ৪৪ এ

অমিয় চৌধুরী  | June 11, 2014

সঞ্জয় নিরুপম কংগ্রেস-এর টিকিটে উত্তর মুম্বাই কেন্দ্র থেকে সংসদীয় নির্বাচনে(২০১৪) লড়ে ছিলেন এবং যথারীতি হেরে গেছেন। ওর নামটা খুবই পরিচিত। কেননা আগে উনি শিবসেনা এবং বিজেপির সঙ্গেও ঘর করে এসেছেন। ফলে ওদের দুর্বলতাটা জানেন। হেরে যাওয়ার বেশ কিছুদিন পরে একটা মজার কথা বলেছেন। নরেন্দ্রভাই মোদীও যদি কংগ্রেস-এর টিকিটে দাঁড়াতেন তবে তিনিও সঞ্জয় এর মতন গো-হারা হেরে যেতেন। সঞ্জয় এর এই বিশ্লেষণে যতটা যুক্তিই থাক না কেন, কথাটার অন্তর্নিহিত মর্ম কঠোর বাস্তব এবং কংগ্রেস এর পক্ষে যথেষ্ট বেদনার। এই নির্বাচনে ঠিক যতটুকু বিজেপির পক্ষে উল্লাসের তার অনেক বেশি বাস্তব ১৩০ বছরের একটা জাতীয় দলের। অর্থাৎ কংগ্রেসিদের কাছে কংগ্রেসের করুণ ভরাডুবির যেমন আপাত গ্রাহ্য কারণ থাকলেও, এই ফলাফল প্রত্যাশিত ছিল না।

যতগুলো জনমত সমীক্ষা হয়েছিল, তার প্রায় সব ক’টিতে বলা হয়েছিল কংগ্রেস-এর আসন ১০০-র নিচে নেমে আসবে। কিন্তু তাই বলে কেউ কিন্তু ভাবেনি যে কংগ্রেস ভারতবর্ষের বহু রাজ্য থেকেই উবে গিয়ে মাত্র ৪৪ এ দাঁড়াবে। নির্বাচনের আগে প্রতি কথার উত্তরে কংগ্রেস বলে গেছে ওদের শিকড় ভারতবর্ষের মাটিতে এমনভাবে প্রোথিত যে কেউই তা উপড়ে ফেলতে পারতে না। যারা এতাবদ কংগ্রেস করেছেন তারা অনুভব করেন যে বহু রাজনৈতিক দলই কংগ্রেস ভেঙ্গে অন্য দলে চলে গেছে বা নতুন দল গঠন করেছে। ওদের নেতাদের আত্মশ্লাঘা – আমরা গভীরভাবে ছিলাম, আছি এবং থাকব। আসলে কংগ্রেস-এর মধ্যে যারা শুধু রাজনীতিই নয়, গভীর ভাবে ভাবেন, ইতিহাসের আঁকা বাঁকা পথগুলির সুলুক সন্ধান জানেন, তারা অবশ্যই বলবেন আজকের কংগ্রেস কিন্তু সেই পুরোনো ঐতিহ্যবাহী কংগ্রেস নয়। এমনকি নরসিম্‌হা রাওয়ের যে কংগ্রেস ছিল এখন তাও নেই। একটা পরিবারকে কেন্দ্র করে কংগ্রেস-এর জোড়াতালি দেওয়া অস্তিত্ব যে এমন গভীর সঙ্কটে পড়বে এটা ওদের এখনো যে কিছু বুদ্ধিজীবী আছেন তাদের ভাবনা চিন্তা করা উচিৎ। নতুবা বিজেপি তথা নরেন্দ্রভাই মোদীর বর্তমানে যে আপোসের রাজনীতি দেখা যাচ্ছে তাতে কংগ্রেস নামক দলটির খন্ড বিখন্ড হয়ে যেতে পারে।

ভয় দেখানোর রাজনীতিতে কংগ্রেস প্রায় সেই ২০০৪ সাল থেকে করে এসেছে তা আর চলবে না। প্রথম ইউপিএ সরকার এর ওপর থেকে বামপন্থীরা যখন সমর্থন তুলে নিল নিউক্লিয়ার ডিলের প্রতিবাদে, সংখ্যালঘু সরকার-এর তখন সংসদ ভেঙ্গে দিয়ে নির্বাচনে গিয়েই নিজেদের বৈধতা প্রমাণ করা উচিৎ ছিল। তা যদি হোত, তবে কংগ্রেস নিশ্চয়ই ১৪৩ থেকে বেশ কিছু আসন বাড়িয়ে সমনীতি সম্পন্ন আঞ্চলিক দলগুলির সঙ্গে রাজনৈতিক আঁতাত বাড়িয়ে ক্ষমতায় ফিরে আসতে পারত। তারা করলো না। ওদের মনে রাখা উচিৎ ছিল যে ওরা ২০০৪-এর নির্বাচনে যখন ১৪৩, বিজেপির আসন সংখ্যাও কিন্তু ১৩৮। অর্থাৎ আঞ্চলিক দলগুলোকে যেমন মুলায়ম সিংহ যাদব, লালু প্রসাদ যাদব বা মায়াবতীদের সৃষ্ট দলগুলিকে সিবিআই ইত্যাদির ভয় দেখিয়ে দীর্ঘ দশ বছর ক্ষমতায় টিকেছিল সংখ্যালঘু কংগ্রেস সরকার। আস্তে আস্তে কংগ্রেস তার ক্ষমতা প্রয়োগের বৈধতা হারাচ্ছিল। তবুও ম্যাজিকের মত ২০০৯ সালে পশ্চিমবঙ্গের মমতার তৃনমূল, করুণানিধির ডিএমকে, অজিত সিংহের লোক জনতা দলের সঙ্গে আঁতাত করে কংগ্রেস তাদের আসন সংখ্যা নিয়ে পেল ২০৬টি। এবার আর পায় কে! বিশেষ কয়েকটি আঞ্চলিক দল এবং বিজেপির সমর্থক মানুষজন বিরক্ত হয়ে উঠেছিল। ঠিক এই সময় ২০০৯তে, কংগ্রেস বামপন্থী দলগুলির এবং বিজেপির বিরুদ্ধে রাজনৈতিক প্রচার চালিয়ে নেতিবাচক ভোটের মাধ্যমে পুষ্ট হয়ে উঠেছিল। কিন্তু বিহারে কংগ্রেস দাঁত ফোঁটাতে পারেনি নীতিশ কুমার আর সুশীল মোদীর সুশাসন এর জন্য। এইবার বহুকাল পরে উত্তর প্রদেশ থেকে ২১টা আসন সংগ্রহ করে। তবুও কংগ্রেস তার সংখ্যা লঘুত্ব ঘোচাতে পারেনি। আর এবার অর্থাৎ ২০১৪ সালে উত্তর প্রদেশে কংগ্রেস দাঁত ফোঁটাতে পারেনি। পশ্চিমবঙ্গের মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় আর তামিল নাড়ুর করুণা নিধির সাহায্যে ২০৬টি আসন নিয়েই সরকার গঠন করে।

এই সরকার অনেক সময় শরিকদের অলখ্যে পেট্রোলিয়াম কোম্পানিগুলোকে প্রায় স্বনিয়ন্ত্রনের সুযোগ দিয়েছে। পণ্যমূল্যের দাম আকাশছোঁয়া হয়ে যায়। এর মূল কারণ টাকার অঙ্কে পাহাড় প্রমাণ দুর্নীতি। এসব পরিলক্ষিত হয়েছে কম্পট্রোলার ও অডিটর জেনারেল এর প্রতিবেদনে। অর্থমূল্যে যার পরিমান ১ লক্ষ ৭৬ হাজার কোটি টাকা। টু-জি ফান্ডের কেচ্ছা। কয়লার ব্লক বন্টনের উদ্দেশ্যে স্বজন পোষণের জন্য বহুকোটি টাকার তছরুপ। এই কোলগেট কেলেঙ্কারিতে প্রধানমন্ত্রীর অফিস জড়িয়ে যায়। সুপ্রিমকোর্টের নির্দেশ অমান্য করায় সিবিআই কর্তা কোণঠাসা হন। চাকরি যায় আইনমন্ত্রীর। রেল দপ্তরে ঘুষের অভিযোগে রেলমন্ত্রীকে পদত্যাগ করতে হয়। এইসব অজস্র কেলেঙ্কারির দোষে দুষ্ট দ্বিতীয় ইউপিএ সরকারের শরিকরা বিশেষ করে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় জনসমক্ষে বলেন – জনবিরুদ্ধ কিছু নীতি গ্রহণ করবার সময় দ্বিতীয় মনমোহন সরকার, শরিকদলগুলোকে কোন পাত্তাই দেননি। মনমোহন সরকারের কফিনে আরেকটা পেরেক পুতে যায়। খুচরো পণ্যে বিদেশী বিনিয়োগের বিরোধিতা করে মমতা কেন্দ্রীয় সরকার থেকে বেরিয়ে আসেন। আর করুণানিধির দলের মন্ত্রীদের দুর্নীতি চেপে না দেওয়ায়, তারাও সরকার পরিত্যাগ করে।

এবারো কিন্তু একটা ঐতিহ্যশালী দলের সরকার ভেঙ্গে দিয়ে জনাদেশ প্রার্থনা করে ভোটে যাওয়া উচিৎ ছিল। তা না করে মায়াবতী এবং মুলায়েম সিংহকে সিবিআই তদন্তের ভয় দেখিয়ে ওদের সাহায্যে কংগ্রেস তার সংখ্যালঘু সরকার টিকিয়ে রাখে। এসব কিছুই মানুষ ভালো চোখে দেখেনি। অথচ জাতীয় এবং রাজ্য স্তরে টেলিভিশন চ্যানেল এ কংগ্রেস এর কিছু পচনধরা মুখ, ওদিকে নরেন্দ্র মোদী আর এদিকে তৃণমূলের নেত্রী মমতাকে গালাগালি করে গেছে সমানে। এরই পরিণাম কংগ্রেস গুজরাটে একটা আসনও পায়নি। আর পশ্চিমবঙ্গে মমতার বিজয়রথের দাপটে কংগ্রেস ছয় থেকে নেমে চার-এ দাঁড়িয়েছে। এই অবস্থা থেকে কংগ্রেস আর বেরিয়ে আসতে পারবে কিনা সেই জায়গায়ই সন্দেহের প্রশ্ন উঠে গেছে।

< Back to List

 
Comments (0)
 
 
Post a Comment Comments Moderation Policy
 
Name:    Email:
 
Comment:
 
 
 
Security Code:
(Please enter the security code shown above)
 

Comments and Moderation Policy

MaaMatiManush.tv encourages open discussion and debate, but please adhere to the rules below, before posting. Comments or Replies that are found to be in violation of any one or more of the guidelines will be automatically deleted.

  • Personal attacks/name calling will not be tolerated. This applies to comments or replies directed at the author, other commenters or repliers and other politicians/public figures. Please do not post comments or replies that target a specific community, caste, nationality or religion.

  • While you do not have to use your real name, any commenters using any MaaMatiManush.tv writer's name will be deleted, and the commenter banned from participating in any future discussions.

  • Comments and replies will be moderated for abusive and offensive language.

×

© 2017 Maa Mati Manush About Us  |  Contact   |   Disclaimer   |   Privacy Policy   |   Site Map