M3 Views

রায়দিঘির কয়েকটি হত দরিদ্র মুসলিম পরিবার আজ নিঃস্ব, সিপিএম এর খুনে বাহিনীর তান্ডব

অমিয় চৌধুরী  | June 28, 2014

রায়দিঘি - দক্ষিণ ২৪ পরগনার মথুরাপুর দু’নম্বর ব্লকের মধ্যে পরে। অঞ্চলটার নাম খাড়ি। রায়দিঘিতে থানা আছে। অথচ এই অঞ্চলেরই দুটিগ্রামে জুনমাসের দ্বিতীয় সপ্তাহে সেই নৃশংসতম ঘটনা ঘটে যায়। বাড়ি থেকে বেরোবার সময় রায়দিঘি নামটা শুনে অনেক কথা মনে আসে। রায়দিঘি নামটার সঙ্গে একটা আভিজাত্যের ছোঁয়া আছে। সামন্ততান্ত্রিক দেশে রাজা জমিদারদের বাড়ির সংলগ্ন বা দূরে এই ধরনের দীঘি দেখা যেত। এই দিঘির জল দরিদ্র গ্রামবাসীদের চাষবাসের জন্য সেচ এবং আরো নানাবিধ প্রয়োজন মেটাতো। এখন আর সেই রাজা জমিদারদের কাল নেই। বহুজায়গায় পুকুর বা দিঘিও হেজে মোজে গেছে। কিন্তু সেই অভিজাত নামটা রয়ে গেছে। রায়দিঘি যে শুধুমাত্র ওই জায়গাটাতেই ছিল তা নয়। পূর্ববঙ্গ, পশ্চিমবঙ্গের বহু স্থানেই রায়দিঘির নাম পাওয়া যায়। এই নামটা বাংলা সাহিত্যে বিশিষ্ট ঔপন্যাসিকদের লেখায় এখনো বড় আকর্ষণীয় হয়ে আছে। এখনকার লেখকদের কলমে একটা রোমান্টিকতার আমেজ ছড়ায়।

যে জায়গার নাম রায়দিঘি, সেই অঞ্চলটায় এখনো কোনো রায়ের দিঘি আছে কিনা এখনো কারোর জানা নেই। আর সেই অর্থে রায়দিঘি পাড়ে যাওয়াও হয়নি। কলকাতা থেকে খুব দূরেও নয়। গাড়িতে দুঘন্টার মধ্যে পৌঁছে যাওয়া যায়। একটা বড় এবং পিচকালো রাস্তা চলে গেছে। অবশ্য বহুদূর বিস্তৃত মাঠের মধ্যে দিয়ে রাস্তাটা যখন গেছে, রাত নামলেই রাস্তা ঘাট জঙ্গল সব একাকার হয়ে যায়। অঞ্চলে এখনো সম্পূর্ণভাবে বিদ্যুৎ পৌছায়নি। অঞ্চলটা মুসলমান প্রধান। রাস্তার দুধারে খানাখন্দ জঙ্গল। ৩৪/৩৫ বছর রাজত্ব করে সিপিএম পঞ্চমে স্বর তুলে বলে- পশ্চিমবঙ্গের পঞ্চায়েত এর মাধ্যমে প্রায় ৩৮ হাজার গ্রাম কে উন্নত করে গেছে। যে কেউ রায়দিঘি অঞ্চলের গ্রামে গেলে সিপিএম এর রাজনৈতিক ভণ্ডামিটা বুঝতে পেরে যাবেন। আধাশহর আর তার পার্শ্ববর্তী গ্রামগুলো ৩৫ বছর আগে যা ছিল, যেমন ছিল তাই রয়ে গেছে।

ঘটনা ঘটার দু’একদিনের মধ্যেই তৃনমূলের নেতারা রায়দিঘিতে গিয়েছিলেন। চাক্ষুষ করে আসেন সেই বীভৎস ঘটনার পরবর্তী অভিঘাত কিভাবে পড়েছিল ঘোষের চক আর সরস্বতীজার গ্রামের অভিশপ্ত পরিবারগুলির ওপর। সেই রাত্রের কথা ভাবলে এখনো আশে পাশে বাস করা পরিবারগুলো শিউরে ওঠে। এই পুরো অঞ্চলের মুসলমান পরিবারগুলো শিউরে ওঠে। এই পুরো অঞ্চলের মুসলমান পরিবারগুলো বিগত প্রায় চার দশকে সিপিএম নামক দলটির সেবা দাসত্ব করে গেছে। পঞ্চায়েত ভোট, সংসদীয় নির্বাচন, বিধান সভার ভোট এমনকি ২০১১ সালের বিধানসভার ভোটেও ভয়ে হোক ভক্তিতে হোক এখানকার মানুষজন সিপিএমকে চটাতে সাহস পায়নি। পরিবর্তন ঘটলো ২০১৩-র পঞ্চায়েত নির্বাচনে। জায়গাটা তৃনমূল কংগ্রেস এর চৌধুরী মোহন জাটুয়ার নির্বাচনী এলাকা। ২০১৩-র নির্বাচনে সিপিএম এখানে বিপর্যয়ের কবলে পরে। হারানো জমি কিভাবে পুনর্দখল করা যায় সেইটেই এখন সিপিএম এর মাথা ব্যাথার কারণ।

দিনটা ছিল মুসলমান পরব সবেবরাতের উৎসব। ১৪ই জুন। আশে পাশের গ্রামবাসীরা বড় রাস্তার ধারে মসজিদ মাজারে। তার আশে পাশেই সবাই উৎসবে মত্ত। তার পরদিনও চলছিল বাজি পটকা ফাটানোর মাতামাতি। উৎসবের মরসুমে কেউই খেয়াল করেনি। বড় রাস্তার ধারে এখনো রয়েছে কিছু মুসলিম পরিবারের একতলা দোতলা পাকা বাড়ি। এগুলো সিপিএম এর আমলের দুধে ভাতে থাকা মানুষের। ৩৪/৩৫ বছর ধরে মিটিং-এ মিছিলে গ্রামের কপর্দক শূন্য শিশু, বৃদ্ধ, স্ত্রীলোকদের সামিল করার দায়িত্বের আর্থিক ফসল। যদিও এখন এখানে সিপিএম অস্তিত্বের সঙ্কটে। এই রকম একটা দতলা বাড়ির একতলায় কদিন ধরেই জমা হয়েছিল কিছু খুনি। প্রায় সেই সময়ই মথুরাপুর, জয়নগর এলাকার মহা মাতব্বর কান্তি গাঙ্গুলি রক্ত গরম করা বক্তৃতা দিয়ে গিয়েছেন(আক্রান্ত এবং তাদের প্রতিবেশীরাই এমন কথা বলেন)।

এখন গ্রামগুলোর অধিকাংশই তৃনমূলের পরিচালিত পঞ্চায়েত এর দখলে। রাগটা ঠিক এইখানেই। ভয় দেখিয়ে খুন খারাপি করে যদি আবার একবার ফিরে আসা যায়। শুধু গাঙ্গুলি মশাই কেন সিপিএম এর দক্ষিণ ২৪ পরগনার অন্যান্য নেতারাও এই দিবাস্বপ্নের স্বার্থকায়ন ভাবতে শুরু করেছেন। তিন বছর হল মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের তৃনমূল কংগ্রেস ক্ষমতায়। তাদের কিছু ভুলভ্রান্তি দেখিয়ে এবং তৃনমূলের তথাকথিত গোষ্ঠীদ্বন্দের প্রতি আঙ্গুল তুলে ঘটিয়ে চলেছেন একের পর এক খুন খারাপি। প্রায় জায়গাতেই খুন হয়ে যাচ্ছে তৃনমূলের যুবনেতা, কর্মী এবং অন্যান্যরা। কিন্তু এই গোষ্ঠীদ্বন্দের দোহাই পেয়ে এবার কিন্তু সিপিএম পার পাবেনা। আর সেই গ্রামগুলো ঘুরে সিপিএম এর এখন পর্যন্ত চালাকিটা দেখে এসেই এমন কথা মনে দৃঢ়মূল হল। যে ঘটনার কথা বলা হচ্ছে, তা জঙ্গলমহলের নেতাই গ্রাম, নন্দীগ্রাম এবং বর্ধমানের মঙ্গলকোটের কথাই আবার স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে। যে দোতলা বাড়ির তলায় বহিরাগত খুনি বাহিনী জমা হয়েছিল- তাতে কারো কিছু মনে হয়নি। স্বাভাবিকভাবেই উৎসবে যোগ দিতে বাইরের লোক আস্তেই পারে।

ঘটনাটা ঘটলো একেবারেই আচমকা উৎসবের পরের দিন রাতে। রাস্তা অন্ধকার, পঞ্চায়েত-এর প্রভাবশালী ৪ জন বাড়ি ফিরছিলেন। হাসানগাজি, হাফিজুল গাজিরা দুই ভাই। ওদিকে আতিয়ার মোল্লা এবং ছপিউল্লা মোল্লা, ওরা সবাই নিরস্ত্র। আতিয়ার বাঁচবার শেষ চেষ্টা করেছিল। ছুটে ঢুকে পরেছিল এক দর্জির দোকানে। কিন্তু হার্মাদরাতো মারতেই এসেছিল। দর্জির দোকানে ঢুকে আতিয়ারকে হাঁসুয়া দিয়ে চোপাতে শুরু করে। বাঁচবার শেষ চেষ্টায় দর্জির শোয়ার ঘরে আশ্রয় নেবার চেষ্টা করে। খুনিরা তখন উন্মাদ। দুটি ঘরই রক্তে রাঙিয়ে দিয়ে চলে যায়। নিরস্ত্র মানুষগুলো অনেক চেষ্টা করেও বাঁচতে পারেনি। প্রায় রাতের অন্ধকারে নির্জন পথে খুন হতে হয় দুই ভাই হাসান গাজি, হাপিজুল গাজিকে এবং ছপিউল্লা মোল্লাকে , রাজনীতির শত্রুতা এমনই ভয়ঙ্কর। বিরোধীদের প্রাণে মেরে দেওয়ার কায়দা একইরকম। হয়ত ভয় অথবা নির্জন অন্ধকার প্রহরে ওই মুহূর্তে দুটি গ্রামের মানুষজন বুঝতেই পারেনি।

বিশিষ্টমানুষ কিছু খুনের পাঁচদিন পরে ওই গ্রামদুটিতে গিয়েছিল। বন জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে খানা খন্দে ভরা উঁচু নিচু ঢালু মাটির রাস্তা কাদা জলে পিচ্ছিল। তবু ভালো বর্তমান গ্রাম পঞ্চায়েতের নেতারা পাশাপাশি কিছু ইঁট ফেলে অতিথিদের পরে যাওয়ার হাত থেকে বাঁচাতে চেয়েছেন। দরিদ্র সম্প্রদায়ের মানুষগুলো কিভাবে বেঁচে আছে না দেখলে বিশ্বাস করা কঠিন। খড়ের ছাদ মাটি ছুঁই ছুঁই। মাটির দেওয়াল দেওয়া ঘরে ঢুকতে গেলে হামাগুড়ি দিয়ে ঢুকতে হয়। মানুষগুলো আর ফিরবে না। প্রত্যেকেই রেখে গেছে তাদের ছেলে মেয় বউকে। সকল বাবা মায়েরই একটি কি দুটি করে  ছেলে। ওদের খাওয়া পড়ার সংস্থান নেই। যদিও পঞ্চায়েত এর নেতারা বলছেন- ওরা দেখবেন। গ্রামের সব মহিলারাই বলছেন – মমতাদিদি না দেখলে আমরা কেউ বাঁচবো না। সিপিএম এখন সর্বত্র এখন এই ধরণের কাজ করে চলেছে। ভাঙ্গা সংগঠন নিয়েও প্রাক্তনমন্ত্রী গাঙ্গুলিবাবুরা বার বার প্রমাণ করে যাচ্ছেন তারা মরেও মরেনি।

< Back to List

 
Comments (1)
 
Pranab Hazra Reply
July 05, 2014
The last line-" Gangulibabura bar bar praman kore jachhen tara moreo mareni" of this article may be a good quotation.May I recall the memory of my student life when I was the student of Burdwan University,some SFI goons injured themselves by the counter attack of the general students.But very soon they came back with more goons,again attacked the college students shouting the slogan " communist can not die " Secondly I remember the delighted CPM leader of Burdwan dist.who after a brutal murder of some TMC activists,organized at Mangalkot,expressed his feeling exultingly that " common people had regained their power of resistance."So no comme
 
Post a Comment Comments Moderation Policy
 
Name:    Email:
 
Comment:
 
 
 
Security Code:
(Please enter the security code shown above)
 

Comments and Moderation Policy

MaaMatiManush.tv encourages open discussion and debate, but please adhere to the rules below, before posting. Comments or Replies that are found to be in violation of any one or more of the guidelines will be automatically deleted.

  • Personal attacks/name calling will not be tolerated. This applies to comments or replies directed at the author, other commenters or repliers and other politicians/public figures. Please do not post comments or replies that target a specific community, caste, nationality or religion.

  • While you do not have to use your real name, any commenters using any MaaMatiManush.tv writer's name will be deleted, and the commenter banned from participating in any future discussions.

  • Comments and replies will be moderated for abusive and offensive language.

×

© 2017 Maa Mati Manush About Us  |  Contact   |   Disclaimer   |   Privacy Policy   |   Site Map