M3 Views

পশ্চিমবঙ্গে রতন টাটা শিল্প (অ)দর্শন

অমিয় চৌধুরী  | August 19, 2014

আবার টাটা। কয়েক বছর হল গুজরাটে চলে গেলেন, ন্যানো গাড়ির যন্ত্রপাতি উত্তরাখণ্ড থেকে এনে নরেন্দ্র মোদীর আনুকুল্যে গুজরাটে সানন্দে চারশো একর জমি নিয়ে ন্যানো গাড়ির জোড়া তাপ্পি লাগাতে শুরু করলেন। সিঙ্গুরেও উনি তাই করতে চেয়েছিলেন। আসলে মূল অভিসন্ধি ছিল প্রত্যেক রাজ্যেই যতটা পারা যায় জমি হাতিয়ে নেওয়া।

বহুকাল আগে সেই ১৯৬০ এর দশকে মধ্যবিহারে জলের দরে কয়েকশো একর জমি কিনে ফেলে রেখেছেন। এত বছরের মধ্যেও কিছুই করেননি। এই রকম আরও কিছু জায়গা আছে। রতন টাটা পশ্চিমবঙ্গকে টাটা করলেন, হাতের মুদ্রায় বিরক্তি প্রকাশ করলেন। রতনবাবু অবশ্য ঠিক টাটা করেননি। খড়গপুরে ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্ক করার জন্য অনেক একর জমি ফেলে রেখেছেন। এতদিনেও কিছু করলেন না। টাটার রতন বুঝে গিয়েছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কৃষক স্বার্থমুখী আন্দোলনে বুদ্ধদেববাবুদের টাটা করলেও সিঙ্গুরের ৯৯৭ একর জমির স্বত্ব ছাড়লেন না। বহুমুখি ফসলের কৃষিজীবি জমিটাকে ধ্বংস করলেন। এর পেছনেও বোধ হয় অন্য কিছু করা বা আবিস্কারের প্যাঁচ ছিল ওঁর উর্বর মাথায়। উর্বর কল্পনা তো রতন টাটারই। শুধু শুধু অমিত মিত্রকে দোষারোপ করে লাভ কী! এখনও তো ওই জমি উদ্ধারের জন্য দিনের পর দিন সুপ্রিম কোর্টের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করতে হবে।

টাটাবাবু উল্লসিত! শোনা যায় টাটারা জনকল্যাণে অনেক কিছু করেছেন। শিল্পায়নের প্রশ্নে জামসেদজি টাটা এখনও একটা মিথ হয়ে আছেন। ওইখানে আসলে পতিত জমির অভাব ছিল না। শিল্প এখনকার মত টেকনোলজি নির্ভর ছিল না। ভারী শিল্প তৈরি করতে প্রচুর শ্রমিক নিয়োগ করা যেত। এখন রতন টাটা ভাওতা দিয়ে সিঙ্গুরের ১০০ থেকে ২০০ ছেলেকে প্রশিক্ষণ দেবেন বলেছিলেন। মাত্র ২০০ থেকে ৪০০ শ্রমিককে নিয়োগ করলেও তো অসংখ্য কর্মহীনদের ওই এলাকায় কাজ দেওয়া যেত না! অসংখ্য কৃষিজীবি কৃষিকাজের জন্য সিঙ্গুরের জমিতে বছরে তিন চারবার চাষ করত আর যারা জমিহীন, বছরের একটা বড় সময় নাবাল খাটতে সিঙ্গুরে আসত। বিগত সেই ২০০৬ সাল থেকে আজ পর্যন্ত কোন কর্মদিবস সৃষ্টি না হওয়ায় তারা বেকার হয়ে আছে। রাজ্য সরকারের কিছু করার নেই। জমি আইনের কূটকচালির সাহায্য নিয়ে টাটাবাবুরা দিব্যি আছেন জমিদারি মেজাজে। এই নাকি টাটা গোষ্ঠীর জনকল্যাণমুখী হওয়ার বছর। সিঙ্গুরের জমি ওরা প্রাণ থাকতে ছাড়তে চায় না। মানুষ না খেয়ে থাক! এবং তার ফলে রাজ্য সরকারের প্রতি আস্থা হারাক!

মানুষের কল্যাণে ন্যাকা ন্যাকা, কখনো বা সস্তা টিটকিরি মেরে কথা বলা রতন টাটাবাবুর স্বভাবে, তা মানুষ বুঝে গেছে। তবে এখন তো রতন টাটা আর আগের মত ক্ষমতায় নেই! টাটা গোষ্ঠীর চেয়ারম্যান এখন সাইরাস মিস্ত্রী। এতদিন পর্যন্ত সিঙ্গুর বা পশ্চিমবঙ্গে শিল্প গড়ে তোলা সম্পর্কে একটা টাটাদের বিন্দুমাত্র গলার স্বর বেরোয়নি। এখন রতন টাটাবাবু ঘুরে ঘুরে বেড়াচ্ছেন আর সুযোগ মত সত্য, অর্ধসত্য মন্তব্য করছেন, যা বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো তো বটেই অন্যান্য শিল্পপতিদেরও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকারের প্রতি বিরূপ করে তুলছে।

মাঝে মাঝে মনে হয় সাধারণ মধ্যবিত্ত বাড়ির একজন, তাও আবার মহিলা মুখ্যমন্ত্রীকে গ্রহন করতে রতনের শ্রেণীচরিত্রে আঘাত করছে। অথবা এমনও হতে পারে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সম্বন্ধে ভিতরে ভিতরে একটা ঈর্ষা বোধের যন্ত্রণা ভোগ করছেন। জেদের বশবর্তী বা গাড়ি নির্মাণকারিদের দেখিয়ে দেওয়ার জন্য একলাখি ন্যানোর উদ্যোগ নিয়েছিলেন। এখন তো ন্যানো গাড়ির বিভিন্ন দাম। একলাখির দেখা নেই, আর থাকবেই বা কেন! একলাখি গাড়ি কেনার স্বপ্ন দেখিয়েছিলেন নিম্নমধবিত্ত সম্প্রদায়কে। প্রথম থেকে একটা রহস্য থেকে গিয়েছিল।

প্রাক্তন বামপন্থী মন্ত্রী সিপিএমের প্রয়াত সুভাষ চক্রবর্তীর কথা স্মরণ করুন। আরে একটা ইঞ্জিনের দামই তো ৬৫ হাজার টাকা। একলাখি গাড়ি শুধু স্বপ্ন দেখাবে দু-চাকার বাইক আরোহীদের। ম্যাচবক্সের মত গাড়ির ইঞ্জিন তো যেকোনো মুহূর্তে পুড়ে যাবে। সুভাষ বাবু এখন আর নেই! থাকলে দেখে যেতে পারতেন, তাঁর কথাটা সত্যি ছিল একশোভাগ। দিল্লীতে চারপায়ি অটো দেখা যেত এক সময়। ন্যানো গাড়ি সোয়া একলাখি, দেড় লাখি বা পৌনে দু লাখির চেয়ে ওই অটোরিক্সাগুলো ঢেড় নিরাপদ। বিভিন্ন দামের ন্যানোর একটা প্রদর্শনী করতে চেয়ে টাটাবাবুরা একখানা মাত্র ন্যানো গাড়ি আনেন দিল্লীর প্রগতি ময়দানে। ওই শোপিস্ ন্যানোটি এক দু মিটার চালিয়ে রতনজি নামলেন। উপস্থিত জনগণের উদ্যেশ্যে বললেন- এই সেই ন্যানো যার তৈরি সম্পূর্ণ এবং বাজারযাতো। “আমরা পেরেছি ডেসপাইট মমতা।” অর্থাৎ মমতার আন্দোলন সত্ত্বেও। একটু চিমটি কেটে দেওয়া আর কী! মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কী ক্ষমতা। ক্ষমতা তো আমার। ছোটো করে একটু হুল ফোটানোর চেষ্টা আর কী!

পশ্চিমবঙ্গ থেকে ন্যানোর ব্যবসা গুটিয়ে ৯৯৭ একর জমিকে তার উর্বরা শক্তি ধ্বংস করে নিজের আয়ত্তে রেখেই মমতা এবং তার দলের বিরুধ্যে আনন্দবাজার পত্রিকায় বিজ্ঞাপণী খবর প্রচার করে পশ্চিমবঙ্গের যুব সম্প্রদায়কে বার্তা দিলেন - খুব ভেবেচিন্তে ২০০৯ এর সংসদীয় নির্বাচনে ভোট দেবেন। গলিতার্থ বুদ্ধদেববাবুদের আবার জেতান। মমতাকে ভোট দেবেন না। টাটার মত একজন শিল্পপতির মুখে এই ধরনের রাজনীতির ভাষা অভূতপূর্ব। ভেতরে ভেতরে অদম্য রাগ অথবা ঈর্ষার বহিঃপ্রকাশই সুন্দরমুখি রতনের ব্র্যান্ড-ভ্যালু। আসলে মমতা সরকারের আমলে শিল্পপতিদের মনে ভয় সঞ্চার করতেই ওঁর যত চেষ্টা। টাটা গ্রুপের অনেক শিল্প উদ্যোগ এখনও পশ্চিমবঙ্গে আছে। যেমন টাটা মেটালিক্স, টিসিএস ইত্যাদি। আর টাটাদের উৎপাদন সামগ্রীর বৃহৎ বাজারও তো পশ্চিমবঙ্গে।

আসলে ক্ষমতার জেদে ওঁর বুকে যে ক্ষত তৈরী হয়েছিল, তাকে চুলকিয়ে চুলকিয়ে ক্ষতটাকে বাড়িয়ে রেখেছেন। এখনও ভুলতে পারছেন না যে টাটা গ্রুপের কার্যকরী সভাপতির পদটি তাঁর কাছে আর নেই, সমগ্র মালিকানা থাকা সত্ত্বেও। কী বালখিল্য দর্শনায়ণ!

বিমানবন্দর থেকে রাজারহাট, নিউটাউন হয়ে আসতে আসতে তিনি কোনও শিল্পায়নের চিহ্ন দেখেন নি। দেখবেন কি করে! ওঁর চোখে শিল্প মানে তো – সক্তপক্ত চিমনি - যা দিয়ে সর্বদা কালো ধোঁয়া বেরুবে। পরিবেশ টরিবেশ? ও কিছু না! একজন সুদর্শন আধুনিক মানুষ, টেকনোলজি-স্যাভি মানুষ হয়েও মমতা এবং তাঁর কঠিন পরিচর্যার পশ্চিমবঙ্গের প্রতি এখনও রতনবাবু ক্রুদ্ধ। আর তার জন্যেই সিঙ্গুরের জমির সূচাগ্রও ছাড়তে রাজি নন। আসলে টাটা কর্তারা কোথাও, কখনোও জমিদারত্ব ছাড়েন না।

< Back to List

 
Comments (0)
 
 
Post a Comment Comments Moderation Policy
 
Name:    Email:
 
Comment:
 
 
 
Security Code:
(Please enter the security code shown above)
 

Comments and Moderation Policy

MaaMatiManush.tv encourages open discussion and debate, but please adhere to the rules below, before posting. Comments or Replies that are found to be in violation of any one or more of the guidelines will be automatically deleted.

  • Personal attacks/name calling will not be tolerated. This applies to comments or replies directed at the author, other commenters or repliers and other politicians/public figures. Please do not post comments or replies that target a specific community, caste, nationality or religion.

  • While you do not have to use your real name, any commenters using any MaaMatiManush.tv writer's name will be deleted, and the commenter banned from participating in any future discussions.

  • Comments and replies will be moderated for abusive and offensive language.

×

© 2017 Maa Mati Manush About Us  |  Contact   |   Disclaimer   |   Privacy Policy   |   Site Map