M3 Views

যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রায় অচলাবস্থা মাসাধিক কাল ধরে চলছেই
(শেষাংশ)

অমিয় চৌধুরী  | October 20, 2014

যদিও যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আন্দোলনের সেই বীভৎসতা নেই এখন আর। কতদিন আর দম থাকে। তবে এরা কারা এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে একটু পেছনে তাকাতে হবে। ঠিক অক্টোবরের ১৬তে আন্দোলনের এক মাস পূর্ণ হোল। সেপ্টেম্বরের ১৬ তারিখের গভীর রাত্রি অবধি যখন অস্থায়ী উপাচার্য অভিজিৎ চক্রবর্তীকে ঘেরাও করে রাখা হয়েছিলো, তখন স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠেছিল এরা কারা! শুধুই কি যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র? অনেকেরই মত ছিল যে ওই আন্দোলনকে তীব্রতর করতে বেশ কিছু রাজনৈতিক দলের - সে কংগ্রেসই হোক আর সিপিএম ও এস ইউ সি হোক - মানুষজন ওখানে উপস্থিত ছিল। তবে তা প্রমাণ করা সহজ ছিল না। প্রমাণটা পাওয়া গেলো একটা সবজান্তা টেলিভিশন টক শোয়ের প্রায় স্থায়ী কিছু এবং আরো বেশি সবজান্তা রাজনীতিকের কথা বার্তায়।

একটা উদাহরণ দেওয়া যাক। নিজেকে তিনি যাদবপুরের প্রাক্তনী বললেন। স্বীকার করলেন ওই আন্দোলনের রাত্রে তিনি হাজির হয়ে গিয়েছিলেন। ওই পণ্ডিত তার্কিক মানুষটি আগে কংগ্রেসের প্রতিনিধি হয়ে বসতেন। সম্প্রতি দক্ষিণ বারাসাতের উপনির্বাচনে বিজেপি প্রার্থী শমিক ভট্টাচার্য জয়লাভ করবার পরেরদিন ওঁর মনে হল কংগ্রেসের আর কোনও আশা নেই। অতএব কংগ্রেসে পড়ে থেকে রাজনৈতিক ভাগ্যটা নষ্ট করে লাভও নেই। সঙ্গে সঙ্গে বিজেপিতে যোগ দিলেন। ব্যাপারটা বুঝুন - যে শমিকের অর্থাৎ বিজেপির বিরুদ্ধে দর্শকের দিকে তাকিয়ে গলা ফাটাতেন, তিনিই শমিক ভট্টাচার্যের সমর্থনে তৃণমূল, তৃণমূল নেত্রীকে অভব্য আক্রমণ করতে শুরু করেছেন। সেদিন এঁদের অনেকে ছিল যারা ছাত্রদের নৈতিক এবং মানসিক উৎসাহ বর্ধনের কাজটা করে দিচ্ছিলেন। তৃণমূল সমর্থিত উপাচার্যকে মানসিক ভাবে হেয় করাই উদ্দেশ্য ছিল।

ছাত্র আন্দোলন আগেও অনেক হয়েছে। সে ষাটের এবং সত্তরের দশকের গোড়ার দিকে। কিন্তু তার এমন বীভৎস রূপ ছিল না। কেননা তারা পড়াশোনা করতে আসা ছাত্র। আর এরা তো জেনেই আসে - মাস্টারমশাইরা পড়াবেন ৩/৪ টি বিষয়, প্রশ্ন করবেন তাঁরা, এবং খাতা দেখাও হবে তাঁদের দ্বারা। প্রত্যেক ক্লাসে ৫০ জনের বেশি ছাত্র ভর্তি হবে না। অতএব মোটামুটি ভাল ফল হবে। কেননা এটা কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় নয়। ইউজিসি-ন্যাকের তারা খচিত একনম্বর বিশ্ববিদ্যালয়! বিশেষ করে মাস্টারমশাইরা সবাই সিপিএম এর আমলে চাকরি পেয়েছেন। শাসকগোষ্ঠীকে সক্রিয় সমর্থন করলে এবং সবকাজে (কুকাজও হতে পারে) সমর্থন জানালে আর কোন সমস্যাই থাকে না। সিপিএম স্বামী আর স্ত্রী- যিনি আবার শিক্ষক সমিতির সচিবও বটে, শিক্ষকদের একজোট করে বললেন - এই উপাচার্য অভিজিৎ চক্রবর্তী - এখন যিনি আবার উপাচার্য হিসেবে চার বছরের স্থায়িত্ব পেয়েছেন, তাঁর অফিস পরিচালনায় সহযোগিতা করা হবে না। তবে ক্লাসে ছাত্র এলে ক্লাস করে দেওয়া যাবে।

ছাত্রদের আন্দোলন কিন্তু সব ছাত্রদের নয়। আন্দোলনকারী এবং তাদের শুভার্থী বলে পরিচয় দিয়ে রাজনীতির ফায়দা তোলা মানুষজন। ছাত্রদের দিয়ে আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার মূল স্তম্ভ। এমনটা মনে হতেই পারে। ঠিক একমাস পরে স্থায়ী হয়ে সেদিন উপাচার্য অভিজিৎবাবু বিশ্ববিদ্যালয়ে ঢুকতে গিয়ে প্রচণ্ড বাধার সামনে পড়ে গিয়ে অরবিন্দ ভবনের সামনে বসে পড়লেন। অশ্রাব্য কটু কটূক্তি শুনেও তিনি বললেন- আলোচনার মাধ্যমেই সব ঠিক হবে। কিন্তু তাতে কি হবে! কুৎসিত ভাষায় তাঁকে ওরা আক্রমণ করলো একদিকে, আর কাগজে ছবি তোলার জন্য দুদিকে দাঁড়িয়ে লাইন করে উপাচার্য্যকে তাঁর অফিসে যেতে দেওয়া হল। কিন্তু উপাচার্যর পদত্যাগের দাবিতে সেই ছাত্ররা অনড়। এদের মধ্যে খুঁজলে দেখা যাবে কেউ সফিস্টিকেটেড নকশাল বা তত্ত্বগত মাওপন্থী। এরা কিঞ্চিৎ পরিবর্তিত নকশাল এবং মাওবাদী। শোনা যাচ্ছে সত্যিকারের মনোযোগী কিছু ছাত্র ছাত্রী শান্তিনিকেতনপন্থী। গাছতলায় বসে কিছু কিছু ক্লাস করছে। আর ছাত্রসহ হিসেবী প্রাক্তনী যাঁরা অধিকাংশই এখনো পোকায় খাওয়া বামপন্থী সুযোগ সন্ধানী রাজনীতিক, তাঁরা কলেজ স্কোয়ারে বসে পড়বেন। ওখান থেকে মিছিলও করবেন আজ ২০শে অক্টোবর।

অর্থাৎ এই সব বাইরের লোকেরা, কিছু প্রাক্তনী যাদবপুরের আন্দোলন থামতে দেবে না। এই ছাত্রদের সাথে মিশে আছে সেই পুরোন ধ্যান-ধারণার পতাকাবাহী নকশালী। ছাত্রদের ষাট-সত্তর দশকের ছাত্ররা বর্তমান ছাত্রদের উত্তরসূরী করে রেখে যেতে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। পূর্বসূরীরা কী করতো বা কতটা করতে পারতো তাঁর দু’একটি নিদর্শন মনে পড়ছে। নকশাল ছাত্ররা বেশিরভাগই প্রেসিডেন্সী কলেজের। সঙ্গে কিছু আলজেরীয় দার্সনিক ফ্রাঞ্জ ফ্যাননের সংজ্ঞায় লুম্পেন প্রলিটারিয়েট। নকশাল ছেলেরা কলেজ স্কোয়ার থেকে বিদ্যাসাগরের মূর্তি ভেঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ে ঢুকলো। উপাচার্য তখন সত্যেন সেন। ওঁকে ওঁর ঘরের বাইরে ৪০/৫০ জন তখন অশ্রাব্য ভাষায় গালি গালাজ করছে। এমনকী চেয়ার তুলে ওঁকে মারতেও উদ্যত। সেইদিন এই সব মারমুখি ছাত্রদের হাত থেকে উপাচার্য সত্যেন সেনকে রক্ষা করেছিলেন গোপাল বন্দ্যোপাধ্যায়। পরে যিনি পরীক্ষা নিয়ামক হন। সেই বীভৎসার সময় গোপালবাবু পিছনের দরজা দিয়ে উপাচার্যকে বার করে নিয়ে এসেছিলেন। সেই দিন দ্বারভাঙ্গা বিল্ডিঙে দাঁড়িয়ে মনে হয়েছিলো এই সব যারা রাজনীতির প্রচ্ছায়ায় বড় হয়ে উঠছে তাঁদের বিবেক চুরি হয়ে গেছে।

সেই সব অন্ধকারচ্ছন্ন ভয়ঙ্কর দিনের স্মৃতি অবসরপ্রাপ্ত অনেক শিক্ষকেরই মনে থাকার কথা। শ্রেনী শত্রু খুন হচ্ছে। ঘন দুপুরেই অন্ধকার নেমে আসছে। তিনটের পরে কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়গুলো আর খুলে রাখা যাচ্ছে না। রাষ্ট্রযন্ত্রকে সন্ত্রাসিত করতে নিরপরাধ ট্র্যাফিক পুলিশকে খুন করা হচ্ছে। অন্ধকার নামার আগেই রাস্তা, পার্ক সুনসান। এই প্রসঙ্গে তৎকালীন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহ-উপাচার্য অম্লান দত্তের কথা মনে পড়ছে। শারীরিকভাবে দুর্বল কিন্তু অসম্ভব সাহসী। একদল ছাত্র ওঁকে আক্রমণ করতে এসেছে। ঘেরাও করে মানসিক আক্রমণ। ওঁর সামনের টেবিলে বসে পড়েছে। আর বাইরে একদল ছাত্র ঘুরছে আর শ্লোগান দিচ্ছে- একটা আমেরিকান কুত্তা বিক্রি আছে। দাম কম কেননা এটা খোঁড়া। অম্লানবাবু নির্বিকার। এর পরে অম্লানবাবু দেশ পত্রিকার একটা সংখ্যায় “মানুষ” নামে একটা অসাধারন প্রবন্ধ লিখেছিলেন। কিন্তু সেই প্রবন্ধে উনি কখনই ছাত্রদের এই তাণ্ডবের কথা লেখেননি।

যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের নিরামিষ ছাত্রদের কথা এবং কাজ দেখে এই কথাই এখন মনে আসছে।

< Back to List

 
Comments (0)
 
 
Post a Comment Comments Moderation Policy
 
Name:    Email:
 
Comment:
 
 
 
Security Code:
(Please enter the security code shown above)
 

Comments and Moderation Policy

MaaMatiManush.tv encourages open discussion and debate, but please adhere to the rules below, before posting. Comments or Replies that are found to be in violation of any one or more of the guidelines will be automatically deleted.

  • Personal attacks/name calling will not be tolerated. This applies to comments or replies directed at the author, other commenters or repliers and other politicians/public figures. Please do not post comments or replies that target a specific community, caste, nationality or religion.

  • While you do not have to use your real name, any commenters using any MaaMatiManush.tv writer's name will be deleted, and the commenter banned from participating in any future discussions.

  • Comments and replies will be moderated for abusive and offensive language.

×

© 2017 Maa Mati Manush About Us  |  Contact   |   Disclaimer   |   Privacy Policy   |   Site Map