M3 Views

“হোক কলরব” এখন চুম্বনাক্রান্ত-উচ্চ উচ্চারণ স্তিমিত প্রায়

অমিয় চৌধুরী  | November 17, 2014

চুম্বনে চুম্বনে হোক কলরব। কিন্তু আশ্চর্য কলরব আস্তে আস্তে নেমে আসছে। যাদবপুরের সেই অল্পস্বল্প সব জেনে যাওয়া ছাত্র ছাত্রীদের ঢোঁক গিলে ফেলার অমোঘ আকর্ষণের স্তিমিত কলরব শুধু যাদবপুর থানার আকাশে বাতাশে ভেসে আছে। প্রতিবাদের নাকি অজস্র ভাষা আছে। তবে এ ভাষা আমাদের বাঙালী কেন ভারতীয় সংস্কৃতিতে এমন ভাষা শুধু রুধ্বদ্বার ঘরের মধ্যেই মুক্তি খুঁজে নেয়। জানতে ইচ্ছে করে এরা তো আমার আপনার বাড়ির ছেলেমেয়েই! আমরাই তো ওদের এই অধিকার দিয়ে দিয়েছি। অতএব বৃদ্ধ মহিলা চুল হাইলাইট, সেজেগুজে অল্পবয়সী হয়ে অতি পরিচিত কয়েকটি মুখের সঙ্গে চ্যানেলে চ্যানেলে ঘুরে বেড়ান। ছাত্রদের বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যকে সরানোর বেআইনি গণভোটের পর্যবেক্ষক হয়ে ওদের উৎসাহ যোগানোর কাজটা বন্ধ হয়ে যাবে? কেননা “হোক কলরব” এতো তাড়াতাড়ি থিতিয়ে আসায়, ওঁদের রাজনৈতিক টেলিভিশন কপচানি বন্ধ হয়ে যাবে। অসুন্দর সুন্দর মুখগুলো আর রোজ রোজ দেখানো হবে না। এটা সত্যিই দুঃখের কথা!

যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগে আগেও হয়েছে আন্দোলন। তখন প্রায় মধ্যযুগীয় সিপিএমের রাজত্ব। কোনো কুৎসিত স্লোগান নয়। দিনরাত ওখানে বসে থাকা। গানে গীটারে ওঁদের ঠাণ্ডা রাগটাকে একটু গনগনে করে নেওয়া। একটু অবাক লাগছে উপাচার্য অভিজিৎ চক্রবর্তীর অপসারণ চেয়ে ছাত্র, ছাত্রী, বহিরাগত এবং কংগ্রেস থেকে বিজেপিতে ভিড়ে যাওয়া প্রাক্তনীরা কলরবে রয়েছেন। অথচ মান্যবর সুনন্দ সান্যালের মতো গুণী পণ্ডিত মানুষরা নেই অবশ্যই দৃশ্যত। পরে আবার উল্লেখ করা যাবে।

তখন উপাচার্য ছিলেন অশোকনাথ বসু। সালটা যতদূর মনে পড়ছে ২০০৫। অশোকনাথ কিন্তু সিপিএমের ছাপমারা মানুষ ছিলেন। আপত্তির কিছু নেই। এই সব নির্বাচনগুলোর অধিকাংশই রাজনৈতিক। একমাত্র তফাৎ ছিল কংগ্রেসের এ আর শর্মা। তিনি রাজ্যপাল। তিন সদস্যের একটা প্যানেল গেলো তাঁর কাছে। তিনি সরকারের অর্থাৎ ক্রীড়া মন্ত্রীর উপদেশ অগ্রাহ্য করে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য নির্বাচন করলেন সন্তোষ ভট্টাচার্যকে- যিনি একদা ঘোর বামপন্থীই ছিলেন। এই ক্ষেত্রে শিক্ষকরা নয়, কর্মচারিরা আন্দোলন শুরু করলেন। সে এক অকথ্য অত্যাচার। সুনীলবাবু, পরিমলবাবুরা (পদবী ভুলে গেছি, মনে রাখবার কথাও নয়) তখন অশিক্ষক কর্মচারিদের নেতৃত্ব দিচ্ছেন। ওরা সন্তোষবাবুকে গাড়ি থেকে নামতে দিতেন না। কখনো সখনো পোড়া বিড়ির শেষ অংশটা ওঁর গায়ে ছুড়ে দিতেন। অকথ্য অভব্য ব্যবহার করতেন (দেখুন সন্তোষবাবুর লেখা- Red star over Calcutta University)। শেষে এমন অবস্থা দাঁড়ালো যে সন্তোষ ভট্টাচার্য আর অফিসে আসতে পারতেন না। বাড়িতে বসে ফাইল পড়তেন। এমনকি অবসর নেওয়ার পরেও ওঁর বেতন অর্থাৎ প্রাপ্য অর্থ দীর্ঘদিন আটকে রাখা হয়েছিলো। সেই ১৯৮৫ সালের পরবর্তি সময়ের কথা। সিপিএম পরবর্তিকালে যে দাঁত নখ বার করেছিলো, তখনও সেই যুগের সূত্রপাত হয়নি।

মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন জ্যোতি বসু। সন্তোষবাবু ওঁর পুরনো দস্তি। তবু জ্যোতিবাবু টুঁ শব্দটি করেননি সন্তোষবাবুর সেই চরম হেনস্থায়। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রায় সবই বামপন্থী। শিক্ষকদেরও সেইসব ভুলে যাওয়ার কথা নয়। যুগেরও পরিবর্তন হয়েছে। এঁরাও কিন্তু আজকাল ছাত্রদের আন্দোলনে মদত দিয়ে যাচ্ছেন। সে তাঁরা দিতেই পারেন। সরকারের বিরুদ্ধে তাঁদের ক্ষোভ আছে-প্রাপ্য গণ্ডা নিয়ে। কিন্তু সুচিন্তিত ভাবে ছাত্র আন্দোলনটা থামিয়ে দিয়ে পরবর্তী কোনো একটা সময় শিক্ষক মশাইরা তাঁদের দাবি দাওয়ার কথা খুব বড় করেই বলতে পারতেন। তা না করে তারা ‘নারদ’ ‘নারদ’ করে যাচ্ছেন। ছাত্র আন্দোলন চালিয়ে রাখতে এফ আই আর করতে ছাত্রদের সঙ্গে থানায় নিয়ে গিয়ে জোর খাটাচ্ছেন এক শিক্ষক কেননা সেই দিন পুলিশি আক্রমণ নাকি ভয়াবহ ছিল। তিনি সংসদীয় নির্বাচনে হারা নেতা পার্থপ্রতিম বিশ্বাস। ইনি বাইরেও নেতা ভেতরেও নেতা। আর হবেই বা না কেন! ঋতব্রত সরকারের “হোক কলরব ও যুগের সন্ধানী” নিবন্ধ থেকে যানা যায়, পার্থপ্রতিম বিস্বাসের যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হওয়াটাই পার্টির মদতে। তিনি প্রায় কোন পরিক্ষাতেই (যাদবপুর তথা কথিত দেশের সেরা বিশ্ববিদ্যালয়) একবারে পাস করেননি।

অনেকগুলিতেই সাপ্লিমেন্টারী পরিক্ষায় উৎরেছেন। (জনস্বার্থ বার্তা; নভেম্বর, ২০১৪) এমনটাইতো হওয়ার কথা। এঁরাই তো এখন রাজনীতির বিশেষত বাম রাজনীতির চালিকা শক্তি। এঁদের মদতেই যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে সব কিছু হয়ে থাকে। এঁরা না চাইলে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য থাকা চলবে না। এঁদের দ্বারাই বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্য, রেজিস্টার পরিচালিত হবেন। অন্যথায় চলবে “হোক কলরব” এবং অশান্ত চুম্বনে চুম্বনে প্রতিবাদ এঁদের কোমর ভেঙ্গেছে কিন্তু ক্ষেত্রবিশেষে মাতব্বরি থামে নি। ওঁরা গত তিন দশকের ওপর যাদবপুরের শিক্ষক নির্বাচনে বামপন্থী ছাড়া প্রায় কারুকেই নিযুক্ত হতে দেয়নি। অভিজিৎ চক্রবর্তীর মত এক ভিন্ন মতের মানুষ গুচ্ছ গুচ্ছ বামীদের সঙ্গে থাকবেন কেন! অতএব ছলে বলে কৌশলে আন্দোলন করো; ছাত্র ক্ষেপাও। তবে এই মুহুর্তে “হোক কলরবের” বেলুন প্রায় চুপসে গেছে। বাকি হাওয়া যেটুকু আছে তাই দিয়ে যতদিন চলে। উপাচার্য প্রাথমিকভাবে কিছু ভুল করলেও এখন তো তিনি সহযোগিতার জন্য আহ্ববান করছেন। মন্ত্রীমশাই সকলের সঙ্গেই আলোচনায় বসেছেন। বসতে চাইছেন আবারও। তবু তিনি যাদবপুর এলাকায় “কালে পতাকা” দেখছেন। আশ্চর্যের কিছু নেই। এটাই ওই সব নিলাঞ্জনা, গৌতমদের ছাত্র শিক্ষক শিক্ষিকার ভাষা। অভিজিৎবাবু তৃণমূলের ঘরের লোক বলে শুনিনি। কিন্তু গৌতমবাবুদের অনাথনাথ বসু, মনি চক্রবর্তীরা কিন্তু তাঁদের একেবারেই ঘরের লোক ছিলেন। তৃণমূল পরিচালিত শিক্ষা বিভাগেও কিন্তু বহু সিপিএম এর মানুষজন আছেন মমতা বন্দ্যপাধ্যায়ের আনুকুল্যে। সেখান থেকে এই সব যাদবপুরীদের ফিরিয়ে নেওয়া হয়নি।

আবার অশোকনাথ বসুর আমলের কারিগরি বিভাগের ছাত্র আন্দোলনের কথায় আসা যাক। ওদের দাবি কিন্তু উপাচার্য অপসারনের নয়। নিতান্তই নিরামিষ পরিক্ষা, সেমেস্টার সংক্রান্ত ব্যাপারে। গভীর রাত্রে অন্ধকারে মধ্যে পুলিশ ডেকে, আলিমুদ্দিন হয়ে উপাচার্যের নির্দেশে বেধরক মারা হয়েছিলো জমায়েত ছাত্র ছাত্রীদের। কেননা ওরা ছাত্র ফেডারেশনের সদস্য ছিলনা। সারা যাদবপুর অঞ্চলে নিন্দার ঢেউ উঠেছিল। ওরা তার কোন পরোয়া করে নি। সুনন্দবাবুরা সেদিন নিশ্চয় মুখর ছিলেন। আর আজ, রাজনীতির ভুঁইফোড় অসীম আর যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের এক অতি সাধারণ প্রাক্তনী সুজন চক্রবর্তীকে ক্রাচ করে তৃণমূল ছাড়া সর্বত্র গণতন্ত্র খুঁজে বেড়াচ্ছেন। অথচ যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের এক জোচ্চুরি ডিগ্রিধারী শিক্ষককে নিয়ে লেখালিখি করে জনারণ্যে নির্দিষ্ট একক হয়ে উঠেছিলেন। চুম্বনে “হোক কলরব” নিয়ে ওঁরা এখন একটা কথাও বলছেন না। পৃথিবীর কোথাও এমনকি ১৯৬০ এর দশকে পাশ্চাত্তের ছাত্রছাত্রীর “নিও বামপন্থী” আন্দোলনও এমন ন্যাক্কারজনক ছিল না। গণভোট করে তারা শিক্ষার হাল ফেরাতে চায় নি। এখানে “হোক কলরব” শিক্ষক ছাত্রের মিলিত রাজনীতি। এখন স্তিমিত কলরব। কেননা গভীর চুম্বনে ঠোঁট আটকা পড়ে যায়। গলা দিয়ে উচ্চ উচ্চারণ বার হয় না। দলীয় রাজনীতি বিযুক্ত সত্যিকারের ছাত্র ছাত্রীরা একাথা নিশ্চয় বুঝে গেছে। আর উপাচার্যকেও মেপে যূকে পদক্ষেপ করতে হয়। শিক্ষক মশাইরা একটা সময় সহযোগিতা করতে বাধ্য হবেন। মনে ধরিয়ে দেওয়া ভালো। সন্তোষ ভট্টাচার্যকে প্রতিপদে অসহযোগিতা করেছিলো সিপিএম নিয়ন্ত্রিত কর্মচারীবৃন্দ। শিক্ষকরা নয়। এমনকী ছাত্র সমাজও নয়। ব্যতিক্রম ছিল শুধুমাত্র বৃহৎ রাজনীতিতে নাম লেখানো কিছু ছাত্র।

< Back to List

 
Comments (0)
 
 
Post a Comment Comments Moderation Policy
 
Name:    Email:
 
Comment:
 
 
 
Security Code:
(Please enter the security code shown above)
 

Comments and Moderation Policy

MaaMatiManush.tv encourages open discussion and debate, but please adhere to the rules below, before posting. Comments or Replies that are found to be in violation of any one or more of the guidelines will be automatically deleted.

  • Personal attacks/name calling will not be tolerated. This applies to comments or replies directed at the author, other commenters or repliers and other politicians/public figures. Please do not post comments or replies that target a specific community, caste, nationality or religion.

  • While you do not have to use your real name, any commenters using any MaaMatiManush.tv writer's name will be deleted, and the commenter banned from participating in any future discussions.

  • Comments and replies will be moderated for abusive and offensive language.

×

© 2017 Maa Mati Manush About Us  |  Contact   |   Disclaimer   |   Privacy Policy   |   Site Map